স্থানীয় সরকারের পৌর প্রশাসনকে শক্তিশালী ও গতিশীল করার জন্য চেতণার উন্মেষ ঘটানোর প্রচেষ্টা

প্রশাসনিক জটিলতা


রীতি বহির্ভূত ও বিধি পরিপন্থী কতিপয় জারীকৃত নির্দেশাবলী ও আইন দ্বারা

পৌর প্রশাসনে সৃষ্ট জটিলতা ও ক্ষতি নিরসনের নিমিত্তে দৃষ্টি আকর্ষন:

বিগত সরকারের আমলে পৌরসভা প্রশাসনে এমন কতিপয় বিধি-বিধান/নির্দেশনাবলী ও আইন জারী করা হয়-যদ্বারা পৌর প্রশাসনের চেইন-অব-কমান্ড ভেংগে পড়েছে এবং প্রশাসনিক ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহীতা ও শৃংখলা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। এ সমস্ত নিরসনের লক্ষ্যে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো পুন:বিবেচনা ও সংশোধনের নিমিত্তে স্থানীয় সরকার বিভাগের গোচরীভূত ও দৃষ্টি আকর্ষন করছি।

১. পৌরসভার কর্মকর্তা/কর্মচারীদের কার্য বিবরনী (Job Description) সংশোধন করনঃ

বিগত ২০০৫ খ্রিঃ সনে স্থানীয় সরকার বিভাগ হতে প্রকাশিত পৌরসভার কর্মকর্তা/কর্মচারীদের কার্য বিবরনী পুস্তিকায় সরকারের বলবৎ বিধি, নির্বাহী আদেশ ও প্রচলিত নীতিমালা পরিপন্থী কতিপয় বিষয় যুক্ত করায় পৌরসভা প্রশাসনের চেইন- অব-কমান্ড ভেংগে পড়ে এবং নানা জটিলতার উদ্ভব ঘটায়। বিষয়গুলো স্থানীয় সরকার বিভাগের গোচরে এনে তা সংশোধনের জন্য বিগত ২০/০২/২০০৬ খ্রিঃ তারিখে পৌর সচিবগনের পক্ষ থেকে আবেদন জানানো হয়। এ ব্যপারে পরবর্তীতে কোন ব্যবস্থা গৃহীত না হওয়ায় পৌর প্রতিষ্ঠানগুলো মারাত্নকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে।

২. জেলা ও উপজেলা শহর অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের পূর্ত কাজ বাস্তবায়ন নির্দেশিকা সংশোধন করনঃ

বিগত ২০০৪ খ্রিঃ সনে প্রনীত জেলা ও উপজেলা শহর অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের সারপত্র (Project Concept Paper) এবং তদানুযায়ী এলজিইডি কর্তৃক ২০০৫ খ্রিঃ সনে প্রকাশিত উক্ত প্রকল্পের পূর্ত কাজ বাস্তবায়ন নির্দেশিকায় কতিপয় বিধি পরিপন্থী ও সাধারন নীতি বিরূদ্ধ নির্দেশনা জারী করায় পৌর প্রশাসনের আর্থিক ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহীতা মুখ থুবড়ে পড়েছে। বিষয়গুলো স্থানীয় সরকার বিভাগের গোচরে এনে তা সংশোধনের জন্য বিগত ১০/০২/২০০৬ খ্রিঃ তারিখে পৌর সচিবগনের পক্ষ থেকে আবেদন জানানো হয়। এ ব্যপারে পরবর্তীতে কোন ব্যবস্থা গৃহীত না হওয়ায় প্রকারান্তরে দূর্নীতির পথ প্রশস্ত হয়েছে।

৩. মাঝারী শহরে পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন সেক্টর (জিওবি-এডিবি) প্রকল্পের অন্তর্ভূক্ত পৌরসভা সমূহে প্রজেক্ট অপারেটিং একাউন্ট পরিচালনার নিয়ম সংশোধন করনঃ

পৌরসভা প্রশাসনের অধীন যে কোন হিসাব খোলা ও তহবিল পরিচালনা এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে পৌরসভা কার্য বিধিমালা, ১৯৯৯-এর ১২ নং বিধি অনুসরন করতে হয়। সরকারের জিওবি অথবা বৈদেশিক-যে উৎস থেকেই প্রকল্পে অর্থায়ন করা হোক না কেন, প্রকল্পে অর্থায়ন ও আর্থিক ব্যবস্হাপনার নীতি অনুযায়ী পৌর প্রতিষ্ঠানের প্রচলিত আর্থিক বিধানের সাথে প্রকল্পের আর্থিক ব্যবস্হাপনায় কোনরূপ দ্বৈততা থাকতে পারবে না। কিন্তু পৌরসভা পর্যায়ে বর্নিত প্রকল্পের হিসাব পরিচালনার জন্য এই বিধি বহির্ভুত নিয়ম সংযুক্ত করে দাতা সংস্থার দোহাই দিয়ে তহবিল পরিচালনায় কোনরূপ দ্বৈততা সৃষ্টি অবশ্যই সরকারের বলবৎ বিধানের সাথে সাংঘর্ষিক। ইহা মোটেও কাম্য হতে পারে না। তাই জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরাধীন উক্ত প্রকল্পের হিসাব পরিচালনার জন্য জারীকৃত গত ১৫/১২/২০০৮ তারিখের ৩৭৫/১৬ নং স্মারকের নির্দেশনাটি বর্নিত বিধি পরিপন্থী বিবেচিত হওয়ায় সংশ্লিষ্ট পৌরসভার মেয়রগন বিষয়টি স্থানীয় সরকার বিভাগের গোচরীভূত করেন। এক্ষেত্রে প্রয়োজনে ঋন চুক্তির সংশ্লিষ্ট দফা সংশোধন করে সরকারের বলবৎ বিধি সমুন্নত রাখা অপরিহার্য।

৪. পৌরসভার চাকুরীতে ‘সচিব’ পদের বেতন স্কেলে বিদ্যমান অসামঞ্জস্যতা ও বৈষম্য দুরীকরন এবং এ পদের পদমর্যাদা পূন: নির্ধারন করনঃ

পৌরসভা অধ্যাদেশ, ১৯৭৭-এর ৪১-নং ধারা মোতাবেক পৌরসভার চাকুরীতে “সচিব” পদটি আইন দ্বারা সুনির্দিষ্টকৃত সর্বস্তনিক নির্বাহী পদ। এ সার্ভিসের অন্যান্য বিভাগীয় কর্মকর্তার পদগুলো (সহকারী / নির্বাহী / তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, মেডিকেল অফিসার/স্বাস্থ্য কর্মকর্তা-ইত্যাদি) বিধি দ্বারা বিনির্দিষ্টকৃত পদ। আইন দ্বারা specified কোন পদের বেতনক্রম ও পদমর্যাদা বিধি দ্বারা notified পদের চেয়ে নিম্নে হতে পারে না।

কিন্তু বিগত ১৯৮৮ সালে পৌরসভা অধ্যাদেশের ৪২ নং ধারা সংযুক্তি দ্বারা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা পদ সৃষ্টি করায় সচিব পদের পদ মর্যাদা অবনমিত হয়। তারপর ১৯৯৪ সালে শাখা প্রধান উপ-সহকারী প্রকৌশলী পদের পদমর্যাদা ২য় শ্রেনীতে উন্নীত করায় এবং ২০০২ সালে শাখা প্রধান হিসাব রক্ষন কর্মকর্তা পদের বেতন স্কেল ১ম শ্রেনীতে উন্নীত করায় বিভাগীয় প্রধান সচিব পদের বেতন স্কেল উক্ত শাখা প্রধানদের সমান ও ক্ষেত্রবিশেষে নিম্নে চলে যায়। এছাড়া ১৯৯২ সালে সংস্থাপন মন্ত্রনালয়ের অনুমোদিত পৌরসভা সাংগঠনিক কাঠামোয় একই সমন্তরালে অবস্থিত অন্যান্য বিভাগীয় প্রধানদের চেয়ে “সচিব” পদের বেতনক্রম অনেক নিম্নে রাখা হয় । এরূপ অদ্ভুত অসাঞ্জস্যতা ও বৈষম্য পৌর প্রশাসনকে দুর্বল করে রেখেছে। পৌরসভার চাকুরী বিধিমালা, ১৯৯২ এর ১৩(৪) নং বিধি মোতাবেক তা দুরীকরন অপরিহার্য।

এ ব্যপারে পৌর সচিবগন দীর্ঘকাল ধরে আবেদন নিবেদন করে আসছেন। পৌর মেয়রগন এবং এমনকি পৌর কর্মচারীগনও এ বৈষম্য ও অসামঞ্জস্যতা দূরীকরনের জন্য জন্য সরকারের প্রতি প্রস্তাব/দাবী উপস্থাপন করেছেন।

৫. প্রণীতব্য স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) আইনের সংশোধনী বিলে পৌরসভার ‘সচিব’ পদের যথাযথ গুরুত্ব ও মর্যাদা অনুযায়ী এ পদের সংজ্ঞা অন্তর্ভুক্তকরনঃ

রাষ্ট্রের কার্য পরিচালনায় সাংবিধানিক প্রশাসনিক একাংশ (Administrative Unit) হিসেবে পৌরসভা শহর এলাকায় স্থানীয় সরকারের কার্য নির্বাহ করে থাকে। এ সকল প্রতিষ্ঠানের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিগণের পাশাপাশি সাচিবিক দায়িত্ব পালনের জন্য পৌরসভার সার্ভিসে নিয়োজিত ‘সচিব’ পদটি প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্যে একটি ‘সর্বস্তনিক পদ’।

সরকারের কার্য বন্টন নীতিমালা অনুযায়ী একটি প্রশাসনিক একাংশের চাকুরী কাঠামোয় কর্মকর্তা-কর্মচারী ধাপের অন্যান্য সকল পদই ‘সচিব’ পদের অধীনস্থ ও নিয়ন্ত্রণাধীন থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু বিগত ১৯৮৮ সালে স্বয়ংসম্পূর্ণ পৌরসভা চাকুরী কাঠামোয় ‘প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা’ পদটি যুক্ত করে ভিন্ন সার্ভিসের জনবল দ্বারা তা পূরণ করার বিধান রাখায় পৌরসভার চাকুরীতে ‘সচিব’ পদের আইনগত স্বত্ব, মর্যাদা ও গুরুত্ব চরমভাবে খর্ব হয়েছে। বাস্তবে পৌরসভার ন্যায় এত ক্ষুদ্র অধিক্ষেত্রের চাকুরী কাঠামোয় একই প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্যের ‘সচিব’ ও ‘প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা’ – এ দুটো পদ একসাথে রাখার কোন যৌক্তিকতা বা প্রয়োজন আছে কি না – তা ভালো করে ভেবে দেখা দরকার। পৌর পরিষদের প্রধান ‘মেয়র’ যেখানে দাপ্তরিক কাঠামোয় নিজেই ‘প্রধান নির্বাহী’ সেখানে একই কাঠামোয় তার বর্তমানে অধীনস্থ ‘প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা’ পদের ধারণা অস্বাভাবিক ও অমূলক।

এজন্যই এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় স্থানীয় সরকার বিভাগ কর্তৃক গঠিত ঈটখএ-সাব কমিটি তাদের ২০০৬ সালের রিভিউ প্রতিবেদনে পৌরসভা অধ্যাদেশ, ১৯৭৭ এর ৪২নং ধারা রহিত করে ‘প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা’ পদটি ‘সচিব’ পদ দ্বারা প্রতিস্থাপনের প্রস্তাব করেন।

পরবতর্ীতে গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) অধ্যাদেশ, ২০০৮ এর অনুমোদিত কপিতে উক্ত অধ্যাদেশের ২(৪২) নং ধারায় ‘সচিব’ পদটি এভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয় –

”(৪২) ‘প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা’ অর্থ পৌরসভার সচিব, যিনি প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসাবে বিবেচিত হইবেন;”

কিন্তু জারীকৃত স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) অধ্যাদেশ, ২০০৮-এ উক্ত ২(৪২) নং ধারায় এভাবে পরিবর্তন পরিদৃষ্ট হয় –
”(৪২) ‘প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা’ অর্থ পৌরসভার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা;”

উক্ত অধ্যাদেশে আনীত এহেন পরিবর্তন এবং ৪৯(১)(ঙ) নং ধারাদৃষ্টে পৌরসভার চাকুরীতে ‘সচিব’ পদের পূর্ব নির্ধারিত ও সুনির্দিষ্টকৃত আইনগত অবস্থান ভূ-লুন্ঠিত করে মৌলিক অধিকার খর্ব করা হয়েছে। প্রণীতব্য সংশোধিত নতুন আইনে এ বিষয়টি পুনঃবিবেচনার জন্য পৌরসচিবগণ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট আবেদন জানিয়েছেন।

বর্নিত বিষয়গুলো বিবেচনা করে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহনের মাধ্যমে পৌর প্রশাসনকে শক্তিশালী ও গতিশীল করা এবং প্রশাসনিক জটিলতা নিরসনের জন্য অত্যাবশ্যক ও অপরিহার্য।

________________________________________

__________________________

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: