স্থানীয় সরকারের পৌর প্রশাসনকে শক্তিশালী ও গতিশীল করার জন্য চেতণার উন্মেষ ঘটানোর প্রচেষ্টা

স্হানীয় সরকার বিষয়ক প্রশ্নোত্তর


মুখোমুখীঃ স্বাধীন বাংলাদেশে স্বাধীনভাবেই ভাবতে হবে

*প্রশ্নঃ রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহের উন্নয়ণের গুরুত্ব কতটুকু?

উত্তরঃ  সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি সম্পর্কে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান সমূহের যুগোপযুগী উন্নয়ন-কে অগ্রভাগেই স্থান দেয়া হয়েছে। সুতরাং স্বাধীন বাংলাদেশের যাত্রা শুরুর সময় থেকেই এ প্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নয়নে অগ্রাধিকার দেয়ার কাজটি ছিল সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ এবং সাংবিধানিক অভিপ্রায়।

*প্রশ্নঃ তাহলে এ  কাজটি এখন  অব্দি গুরুত্ব সহকারে করা হচ্ছে না কেন?

উত্তরঃ  স্বাধীনতার পর থেকেই রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, হত্যা, ক্যু- এসবের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালিত হয়েছে। পূর্ণ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় দেশটি চলতে পারেনি বলে নীতিনির্ধারনে আমলাতান্ত্রিক এলিটদের ভূমিকার প্রাধান্য ছিল বরাবর। ঔপনিবেশিক ধ্যান-ধারণার বাহক এ শ্রেণী তাদের প্রচ্ছন্ন গোষ্ঠীস্বার্থের বিরোধী বিবেচনা করে স্থানীয় সরকারকে দূর্বল করে রাখার ক্ষেত্রে প্রকাশ্যেই ভূমিকা রেখে চলেছে। সে কারনে আজো সংবিধানের এ অভিপ্রায় বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি।

*প্রশ্নঃ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো যেসব আইন ও বিধিমালা দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে সেগুলো কি মৌলিক অধিকার সুরক্ষা করে?

উত্তরঃ  অধিকাংশ মৌলিক ক্ষেত্র সমূহের জন্য প্রচলিত আইন ও বিধিগুলো তা করে না।

*প্রশ্নঃ এক্ষেত্রে করণীয় কি?

উত্তরঃ  যদি রাষ্ট্রের সংবিধান মানা হয় তাহলে সংবিধানের ০৭নং অনুচ্ছেদ মোতাবেক সংবিধানের প্রাধান্য এবং ২৬-নং অনুচ্ছেদ মোতাবেক মৌলিক অধিকারের সাথে অসমঞ্জস আইনগুলো অবিলম্বে বাতিল বা সংশোধনের ব্যবস্থা করতে হবে। তা জাতীয় সংসদে আলোচিত হতে হবে এবং উপযুক্ত নতুন আইন দ্বারা ঐগুলো বাতিল বা প্রতিস্থাপন করতে হবে। তা নাহলে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার আশা করা অবান্তর।

*প্রশ্নঃ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান কি সরকারী প্রতিষ্ঠান?

উত্তরঃ  হ্যাঁ।

*প্রশ্নঃ পরিপূ্র্ণভাবে সরকারী না আধা-সরকারী?

উত্তরঃ পরিপূ্র্ণভাবেই সরকারী।

*প্রশ্নঃ তাহলে অনেকে এগুলোকে স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান বলেন কেন?

উত্তরঃ  ইহা শাব্দিক ভুল প্রয়োগ। ইউনিটারী সরকার ব্যবস্থায় অনেকগুলো প্রশাসনিক একাংশ মিলেই পরিপূ্র্ণ সরকার। অর্থাৎ রাষ্ট্রের সবগুলো প্রশাসনিক একাংশের যোগফলই একটি রাষ্ট্রের সাধারণ প্রশাসন বা নির্বাহী বিভাগ তথা সরকার। কর্মভাগ বা অধিক্ষেত্রভাগ দিয়ে সরকারভাগ বুঝায় না। শুধুমাত্র সরকারের নিয়ন্ত্রণ বহির্ভূত অধিক্ষেত্র বা শাসন ব্যবস্হার ক্ষেত্রেই স্বায়ত্ব-শাসন প্রযুক্ত হতে পারে। আমাদের দেশের স্হানীয় সরকারের অধিক্ষেত্র সমূহ সাংবিধানিকভাবেই সরকার বা নির্বাহী বিভাগের অন্তর্ভূক্ত ও নিয়ন্ত্রণাধীন। এগুলো সরকারেরই অংশ মাত্র।

*প্রশ্নঃ বিষয়টি আরেকটু পরিষ্কার করে বলবেন?

উত্তরঃ দেখুন, শুধুমাত্র ব্যাক্তি বিশেষের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা বা ধার করা বিদেশী শব্দ দ্বারা রাষ্ট্র পরিচালনার উপাদানসমূহকে ব্যখ্যা করলে চলবে না। এক্ষেত্রে একমাত্র আইনসম্মত ভিত্তি হলো রাষ্ট্রের সংবিধান। আমাদের সংবিধানের চতুর্থ ভাগের নাম হলো নির্বাহী বিভাগ। রাষ্ট্রের যাবতীয় কার্য পরিচালনার জন্য বিদ্যমান তিনটি মূল ভাগের মধ্যে নির্বাহী বিভাগ হলো একটি। অপর দুটি হলো- আইনসভা ও বিচার বিভাগ। এ নির্বাহী বিভাগই হলো সরকার। সংবিধানে নির্বাহী বিভাগের মধ্যে ০৫ টি পরিচ্ছেদ রয়েছে। এগুলো- (১) রাষ্ট্রপতি, (২) প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীসভা, (৩) স্থানীয় সরকার, (৪) প্রতিরক্ষা কর্ম বিভাগ ও (৫) অ্যাটর্নী জেনারেল।

সুতরাং বুঝতেই পারছেন, স্থানীয় সরকার রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগের সরাসরি অংগ। স্থানীয়ভাবে অর্থাৎ জনগনের একেবারে পাশে থেকে সেবা দিবে ও রাজস্ব নিবে স্থানীয় সরকার; আর এগুলোর কাজ দেখাশুনা, নিয়ন্ত্রন, মূল্যায়ন এবং এতদুদ্দেশ্যে নীতিমালা, বিধি-বিধান ও নির্দেশাবলী দেবে মন্ত্রী পরিষদ। সরকারের সর্বোচ্চে আছেন রাষ্ট্রপতি। মন্ত্রী পরিষদ বা তাঁদের সহযোগীরা স্থানীয় পর্যায়ে এসে হাতে কলমে রাষ্ট্রের সেবা কাজগুলো করতে পারেন না। এজন্যই সরকারের গুরুত্বপূর্ন অংগটি হলো স্থানীয় সরকার। সংবিধানের ১১ অনুচ্ছেদ মোতাবেক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় প্রশাসনের সকল স্তরেই কাজগুলো করবেন স্থানীয়ভাবে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা। তাদের সহায়তা করবেন সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীগণ। মন্ত্রীসভার সহায়ক কর্মকর্তা-কর্মচারীগণ স্থানীয় সরকারের কাজের জন্য নয়।

*প্রশ্নঃ তাহলে আপনি বলছেন,স্থানীয় সরকারের কর্মকর্তা-কর্মচারীগণ সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারী?

উত্তরঃ  নিঃসন্দেহে। আগেই তা বলা হয়েছে।

*প্রশ্নঃ কিন্তু সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভার চাকুরীতো সরকারী চাকুরী বলে পরিচিত নয়। আবার এসব সার্ভিসে মন্ত্রীপরিষদের প্রশাসন ক্যাডার ও অন্যান্য সার্ভিসের ক্যাডার সদস্যগণ প্রেষনে নিয়োজিত হয়ে কাজ করছেন। তা কেন?

উত্তরঃ  ঠিকই বলেছেন। গলদটাতো এখানেই। রাষ্ট্রের সেবা কার্যগুলো প্রমিত মানে উন্নীত না হবার পেছনে এটাই সবচেয়ে বেশী দায়ী। আমলাতন্ত্রের এলিটরা ঔপনিবেশিক প্রথায় নিজেদের ব্রাক্ষ্মণ এবং অন্য সবাইকে নমঃশুদ্র ভাবতে বেশী পছন্দ করেন। আর নিজেদের স্বার্থ অবারিত করার জন্য হেন কোন পন্থা নেই, যা তারা অবলম্বন না করেন। তারা ব্রিটিশ ও পাকিস্তানী ঔপনিবেশিক ধ্যান জ্ঞান থেকে বেরিয়ে আসতে নারাজ। সংবিধান সুস্পষ্টভাবে বলছে, স্থানীয় সরকার নির্বাহী বিভাগের সরাসরি অংগ। অর্থাৎএর সবকিছুই সরকারী। এমনকি এসব প্রতিষ্ঠানের চাকুরীরত কর্মকর্তা নিয়োগ এবং তাদের নিয়ন্ত্রণও করে থাকে সরাসরি সরকার। অথচ চাকুরীটা সরকারী নয়! আবার এসব প্রতিষ্ঠানের লোভনীয় পদগুলোর চেয়ার তাদের ক্যাডার সদস্যরা দখল করে থাকছেন। পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশনগুলোর আলাদা চাকুরী কাঠামো ও জনবলের বিধান রয়েছে। নিজস্ব চাকুরী কাঠামোর জনবল দ্বারাই সকল পদ পূরণ করা নিয়মসিদ্ধ ও স্বাভাবিক হতে পারে। সেখানে ভিন্ন সার্ভিসের প্রেষনে নিয়োগ বা পদ সংরক্ষণের ব্যবস্থা রাখা একেবারেই অমূলক। এসবের ফলেই সার্ভিসগুলো শক্তিশালী হয়ে বিকশিত হতে পারছেনা। ভিন্ন সার্ভিস থেকে কর্মকর্তারা তিন বছরের জন্য এসে এখানকার আইন ও বিধি-বিধান বুঝতে বুঝতেই সময় চলে যায়। সেবা সম্প্রসারন বা উদ্যোগী হয়ে দরদ দিয়ে কিছু করার মানসিকতা ও সময়ই বা পাবেন কিভাবে? ধরি মাছ, না ছুঁই পানি-ধাঁচের ভূমিকায় থেকে ভালো একটা পোষ্টিং এর আশায় তারা বুক বেঁধে থাকেন। এসব বিবেচনা ছাড়াও সংবিধান অনুসারেই এখানে পূণর্গঠিত একটি শক্তিশালী সার্ভিস ক্যাডার থাকা অত্যন্ত জরুরী।

*প্রশ্নঃ তার মানে আপনি বলছেন যে, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ক্যাডার সার্ভিস গঠন করা প্রয়োজন?

উত্তরঃ  হ্যাঁ। এখানে মন্ত্রিসভার সহায়ক ক্যাডার ও অন্যান্য ক্যাডার সার্ভিসের লোকজনের পোস্টিং দেয়ার মাঝেইতো উহার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি প্রমান করে। এছাড়া আমরা মাঠ প্রশাসনকে যদি দুভাগে ভাগ করি, যথাঃ পল্লী প্রশাসন (Rural Administration) ও শহর প্রশাসন (Urban Administration) তাহলে দেখাবো যে, কৃষি, সমবায়, মৎস্য ইত্যাদি বিভাগের স্থানীয় পর্যায়ে কর্মরতদের সিভিল সার্ভিস ক্যাডারভূক্ত করা হয়েছে। অথচ শহর এলাকাগুলো অনেক বেশী ঘনবসতিপূর্ণ এবং জীবনযাত্রার সকল দিক থেকেই এখানে সেবার চাহিদা ও গুরুত্ব অনেক অনেক বেশী। অদ্ভুদ বিষয় হলো যে, শহর প্রশাসনের সার্ভিসভূক্তরা ক্যাডারভূক্তির মুখ আজো দেখতে পাননি। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো রাষ্ট্রের একই  নির্বাহী বিভাগের অন্তর্ভূক্ত অংগহেতু বিসিএস (স্থানীয় সরকার, শহর প্রশাসন), বিসিএস (স্থানীয় সরকার, পল্লী প্রশাসন), বিসিএস (স্থানীয় সরকার, শহর প্রকৌশল), বিসিএস (স্থানীয় সরকার, শহর স্বাস্থ্য), বিসিএস (স্থানীয় সরকার, পল্লী স্বাস্থ্য)- এরূপ সার্ভিস ক্যাডার গঠন করে স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী ও গতিশীল করা যেতে পারে। তাতে একদিকে যেমন সেবার মান বাড়বে; অপরদিকে তেমনি রাজস্ব আয় বৃদ্ধিসহ রাষ্ট্র-কাঠামো অনেক বেশী শক্তিশালী হবে। ভিত্তি দূর্বল রেখে উপরে অনেক শক্ত কাঠামো তৈরী করা হলেও ইমারত মজবুত হতে পারে না।

arrow-nextপরের পৃষ্ঠা-২ দেখুন

Advertisements

Comments on: "স্হানীয় সরকার বিষয়ক প্রশ্নোত্তর" (1)

  1. Special piece you have realized here! The world wide web is awash of unsuitable writing and I was grabbed by your lucidity. Your determinations are precise and I will forthwith subscribe to your rss feed to remain up to date with your up future day postings. Yes! I accept it, your publishing style is grand and i need to improve on mine decidedly.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

w

Connecting to %s

%d bloggers like this: