স্থানীয় সরকারের পৌর প্রশাসনকে শক্তিশালী ও গতিশীল করার জন্য চেতণার উন্মেষ ঘটানোর প্রচেষ্টা

প্রসঙ্গঃ উন্নয়ণ প্রশাসন


উন্নয়ণ প্রশাসন

স্হানীয় সরকার প্রতিষ্ঠাগুলোর উণ্ণয়ন প্রশাসন সংবিধান সম্মত ভাবে সংস্কার করা জরুরী ও সময়ের দাবী

দুঃখজনক হলেও একথা সত্য যে, পৃথিবীর বুকে একটি শ্রেষ্ঠতম স্বাধীনতার অর্জন বুকে ধারণকরেও কেন জানি হতভাগ্য এ জাতির দুর্দশা পিছু ছাড়তে চায় না। স্বাধীনতার ৩৮তম জন্মদিন পালণের পরও এদেশ উন্নয়ণ অগ্রগতিতে ততটা এগুতে পারেনি, যতটা আমরা দেখি পৃথিবীর অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রে। এশিয়ারই অনেক দেশ আমাদের চেয়ে দূর্বল অবস্হায় থেকে এবং আমাদের পরে স্বাধীন হয়েও উন্নয়ণে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। যারা একদা আমাদের প্রাচূর্যের আকর্ষণে এদেশে ছুটে আসতো, আজ আমাদের যেতে হয় তাদের কাছে সাহায্যের ঝুলি নিয়ে। কেনএ অবস্হা ? উত্তরে সবাই বলেন ‘দুঃশাসন’। কেউ বা বলেন, আমরা ভূখন্ডের স্বাধীণতা পেয়েছি মাত্র;  কিন্তু স্বাধীন দেশে বৃটিশদের বা পাকিস্তানিদের শোষণের জন্য চাপিয়ে দেয়া আইন হতে এখনো মুক্ত হতে পারিনি। আবার অনেকে বলেন, আমরা চেতণায় অনেকেই এখনো বৃটিশ বা পাকিস্তানি রয়ে গেছি। সেই আভিজাত্য বোধ নিয়েই এখনো অনেকে এলিট শ্রেনীর স্বার্থ রক্ষা করে চলেছে হেতু অন্যান্য শ্রনীগুলো শোষিত হচ্ছে এবং প্রকৃত গণতন্ত্রের মুক্তি আসছে না। এখানে আমি বলি, স্বাধীন দেশে নিজস্ব একটি উৎকৃষ্টমানের সংবিধানের মালিক হয়েও এখনো সংবিধান দিয়েদেশটি চলছে না। আর তাই দেশের উন্নয়ণ অগ্রগতি আটকে আছে। সংবিধানকে চার দেয়ালের মাঝে আটকে রেখে, সংবিধানের ভুল অর্থ চয়ণ করে, সংসদীয় আইনের পরিবর্তে সুবিধামত ফরমান, অধ্যাদেশ, বিধি, নির্বাহী আদেশ জারী করে যেভাবে দেশটি চালানো হয়েছে তাতে দেশের দশের উন্নতি না হলেও যাদের উন্নতি ঘটেছে তাদের জনগণ চিনে নেবে ঠিকই। আসল কথা হলো, আর বিলম্ব না করে ক্ষতগুলো চিহ্ণিত করা দরকার এবং কাল বিলম্ব না করে যথোপযুক্ত সংশোধনের ব্যবস্হা নেয়া দরকার। তবেই উন্নয়ণের পথে  এগুনো সম্ভব হবে।

দেশে যেকোন মূল্যে গণতন্ত্রের উত্তরণ, মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং সংবিধানের ১১ অনুচ্ছেদ অনুসারে প্রশাসনের সকল স্তরে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিগণের মাধ্যমে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পালনের ব্যবস্হা করতে হবে। সংবিধানের ১৩৩ অনুচ্ছেদ মোতাবেক প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত কর্মচারীদের নিয়োগ ও কর্মের নিয়ন্ত্রণের জন্য বিতর্কিত ও এলোমেলো বিধিমালাগুলো,যেগুলো দক্ষ ও সুষম বা ইতিবাচক জনপ্রশাসনের অন্তরায়,বাতিল করে আধুনিক ও যুগসইভাবে সংসদীয় আইন প্রণয়ন করা অত্যাবশ্যক। যাতে স্হানীয় সরকার ব্যবস্হার সাথে জাতীয় সরকার ব্যবস্হার সুসমন্বয় করে প্রজাতন্ত্রের সম্মিলিত কর্মবিভাগ সামঞ্জস্যপূর্ণ ও বৈষম্য বিবর্জিতভাবে নতুন করে সংযুক্ত করণ,একত্রিকরণসহ যৌক্তিকভাবে পূণর্গঠন করা সম্ভব হবে। তা করা গেলে জনপ্রতিনিগণের পাশাপাশি সুসংগঠিত ও সুনিয়ন্ত্রিত আমলাতন্ত্র নব উদ্যমে ক্রিয়াশীল হবে। ঘুণে ধরা আমলাতন্ত্রকে ভেঙ্গে দিয়ে নতুনভাবে সাজানো- জাতীয় উন্নয়ণের জন্য ইহা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরী একটি বিষয়। সংবিধানের বাংলা পাঠে অনেক ভুল ভ্রান্তি রয়েছে। এগুলো নিছক ভুল নয়। কায়েমী স্বার্থ এর পেছনে রয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। এরূপ ভুল পাঠ দ্বারা স্হানীয় সরকার ব্যবস্হাকে পঙ্গু করে রাখা হয়েছে। এবার মূল প্রসঙ্গে আসা যাক।

স্হানীয় সরকার প্রতিষ্ঠাগুলো তাদের নিজস্ব উণ্ণয়ন প্রশাসনের আধুনিকায়ণ এবং সুদক্ষ, টেকসই ও গতিশীল করে উহা গড়ে তোলার বিষয়ে অধিক মনোযোগী হবেন এটা এখন সময়ের দাবী।এজন্যে সরকারের সকল সেক্টরের গৃহীত উণ্ণয়ন কর্মসূচী, এ্যাকশন প্ল্যান, উণ্ণয়ন নীতিমালা, সকল জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক চুক্তি, সমঝোতা স্মারক, তহবিল সমূহ ইত্যাদি সম্পর্কে সম্যক ধারণা অর্জন করতে হবে। উণ্ণয়ন সহযোগী দেশ ও সংস্হা সমূহের কার্যাবলী, কার্য পদ্ধতি, শর্তাবলী ও কাজের ক্ষেত্র সমূহ এবং তাদের অফারগুলোর সর্বশেষ খবরা খবর জানার মাধ্যমেও সবিশেষ উপকৃত হওয়া সম্ভব। এছাড়া, জাতীয় পরিকল্পনা ও নীতিমালাভূক্ত  পিআরএসপি (Poverty Reduction Strategy Papers), এমডিজি (Millennium Development Goals), ভিশন ২০২১ (Bangladesh Vision 2021), পিপিপি (PPP Vision Paper 2009) (PPP Policy and Guidelines 2010) (Investment Promotion and Financing Facilities Projects ) (Public Private Partnership Concept taken in Bangladesh) (ADB Hand Book On PPP), বিসিসিএসএপি (Bangladesh Climate Change Strategy & Action Paper)- ইত্যাদি সম্পর্কে সম্যক ধারণা অর্জন এবং স্হানীয় প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে তা অনুসরণে মনোযোগী হলেই সমন্বিত সুষম উণ্ণয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। প্রকল্প গ্রহণের সময় উপকার ভোগী তথা সকল শ্রেণী পেশার জনগণের অংশ গ্রহণ নিশ্চিত করা, বিশেষজ্ঞদের মতামত নেয়া এবং সরকারের সকল বিভাগের সাথে সমণ্বয় থাকা দরকার।

এজন্যে গতানুগতিকতা থেকে বেরিয়ে এসে স্হানীয় সরকারের প্রশাসনিক /নির্বাহী  কর্মকর্তাদের ব্যাপকভাবে প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে আধুনিক উণ্ণয়ন প্রশাসন (Advanced Development Administration) ব্যবস্হা গড়ে তোলা অপরিহার্য। কারন বর্তমান বিশ্ব পরিস্হিতিতে প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে জলবায়ু পরিবর্তনের ভবিষ্যৎ প্রভাব বিবেচনা, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মূল্যায়ণ, অর্থ সংস্হান ও ব্যয়, টেকসই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নির্ধারণ, সুশীল সমাজ ও জনগণকে সম্পৃক্ত করণ, বিশেষজ্ঞের মতামত গ্রহণ, অগ্রাধিকার বিবেচনা, পরিমাপ ও প্রাক্কলণ প্রস্তুত, আর্থিক ও কারিগরি মূল্যায়ণ, জেন্ডার বৈষম্য, ক্ষুধা ও দারিদ্রতা দূরীকরণের প্রভাব বিশ্লেষণ, বহুমূখী ব্যবহারের সম্ভাব্যতা যাঁচাই, পরিবেশ ও স্বাস্হ্য ঝুঁকি বিবেচনা, সরকারের বিভিন্ন বিভাগের সাথে সমণ্বয়, বাস্তবায়ণ অগ্রগতি পর্যালোচণা ও প্রতিবেদন প্রস্তুত, প্রকল্পের কাজ নিয়মিত পরিদর্শণ, মূল্যায়ণ ও সুপারিশ প্রনয়ণ, কাজের গুণগত ও পরিমাপগত সঠিকতা যাঁচাই, জবাবদিহীতা, প্রশাসনিক অনুমোদন ও যোগাযোগ ইত্যাদি বহুমাত্রিক বিষয় যুক্ত হয়েছে। সুতরাং প্রচলিত ধারায় একক ব্যক্তি বা একই গোষ্ঠীর হাতে সকল দায়িত্ব গন্ডিভূক্ত রেখে টেকসই প্রকল্প গ্রহণ, কাজের গুণগত মাণ রক্ষা, অপচয় ও দূর্ণীতি রোধ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহীতা-এসব কোনভাবেই  সম্ভবপর নয়। এক্ষেত্রে দেশের উণ্ণয়ন প্রশাসনে স্হানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান গুলোকে সরাসরি সম্পৃক্ত করার বিষয়টিকে সরকার অনেক বেশী গুরুত্ব দিবে এটাই এখন সকলে প্রত্যাশা করছে।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের নির্বাহী বিভাগ অংশের চতুর্থ ভাগ এর ৩য় পরিচ্ছেদে বর্ণিত ৫৯ নং অনুচ্ছেদ এর অধীনে আইন দ্বারা গঠিত স্হানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান সমূহ প্রজাতন্ত্রেরই এক একটি প্রশসনিক একাংশ। শুধুমাত্র স্হানীয় শাসন কার্যের জন্য নয় বরং স্হানীয় ভাবে প্রজাতন্ত্রের প্রয়োজনীয় সকল কার্য যেমনঃ জনশৃংখলা রক্ষা, জনসেবা (public services) ও অর্থনৈতিক উণ্ণয়নের যাবতীয় পরিকল্পণা প্রনয়ণ ও বাস্তবায়নের কার্যাবলী সম্পাদনের জন্য উপযুক্ত ক্ষমতা, জনবল ও অর্থ বরাদ্দ প্রদানের ব্যবস্হা রেখে সংবিধানসম্মত ভাবেই সংসদে আইন প্রনয়ণ হওয়া আবশ্যক। বর্তমান সরকার জাতীয় সংসদের মাধ্যমে মোটামুটি যুগসই করে এ আইন (Act) সমূহ পাস করেছে। এখন সত্ত্বর সাংবিধানিক অভিব্যক্তি সংরক্ষণ করে উহাদের অধীনে বিধি সমূহ প্রণয়ন এবং স্হানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান গুলোর অনুকূলে জাতীয় বাজেটে অর্থ সংস্হানের বাস্তবানূগ ও সমণ্বিত নীতিমালা তৈরী করা জরুরী। স্হানীয় সরকার, উহার কার্য ও ক্ষমতা সম্পর্কিত সংবিধানের ধারা দুটি নিম্নরূপঃ

“59. Local Government- (1) Local Government in every administrative unit of the Republic shall be entrusted to bodies, composed of persons elected in accordance with law.

(2) Everybody such as is referred to in clause (1) shall, subject to this Constitution and any other law, perform within the appropriate administrative unit such functions as shall be prescribed by Act of Parliament, which may include functions relating to-

(a)Administration and the work of public officers;

(b)The maintenance of public order;

(c)The preparation and implementation of plans relating to public services and economic development.

60. Powers of local government bodies- For the purpose of giving full effect to the provisions of article 59 Parliament shall, by law, confer powers on the local government bodies referred to in that article, including power to impose taxes for local purposes, to prepare their budgets and to maintain funds.”

অতীতে স্হানীয় সরকার প্রতিষ্ঠাগুলোকে জাতীয় সরকারগুলো যে ভাবে নিয়ণ্ত্রণ করেছে, এখন আর তা টিকিয়ে রাখার সুযোগ নেই। কারণ জনগণ এখন অনেক কিছুই জানে। সুশীল সমাজও এসব বিষয়ে অনেক সোচ্চার। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরনের চাপ আন্তর্জাতিক মহল থেকে দিন দিন বেড়েই চলেছে। বর্তমান সরকারও নির্বাচণী ইশতেহারে বিষয়টি এনেছেন এবং সে মোতাবেক নতুন আইন ও বিধি বিধান প্রনয়ণ শুরু করেছেন। এ কাজে যাতে আমলাতাণ্ত্রিক জটিলতা বিলম্ব বা পূর্বের ন্যায় কোন প্রকার জটিলতা বা বিচ্যূতির কারণ হয়ে না দাঁড়াতে পারে সে দিকে সকলের দৃষ্টি রাখতে হবে। কথাগুলো এ জন্যে বলতে হলো যে, অতীত অভিজ্ঞতায় এমনও দেখা গেছে, খোদ সংবিধানই বাংলায় অনুবাদকালে মূল ইংরেজীর সাথে নিজেদের খেয়াল খুশী ও স্বার্থের অনুকূলে বাংলা অর্থ করে ফেলা হয়েছে। যেমন স্হানীয় সরকার সম্পর্কিত উপরের অনুচ্ছেদ দুটোর বাংলা অর্থ তুলনা করলেই বুঝা যাবে উহার পেছনের উদ্দেশ্য কি ছিল!

মূল ইংরেজীতে যেভাবে আছে

বাংলায় যেভাবে অনুবাদ করা হয়েছে

CHAPTER III- LOCAL GOVERNMENT

59. Local Government– (1) Local Government in every administrative unit of the Republic shall be entrusted to bodies, composed of persons elected in accordance with law.

(2) Everybody such as is referred to in clause (1) shall, subject to this Constitution and any other law, perform within the appropriate administrative unit such functions as shall be prescribed by Act of Parliament, which may include functions relating to-

(a)Administration and the work of public officers;

(b)The maintenance of public order;

(c)The preparation and implementation of plans relating to public services and economic development.

60. Powers of local government bodies– For the purpose of giving full effect to the provisions of article 59 Parliament shall, by law, confer powers on the local government bodies referred to in that article, including power to impose taxes for local purposes, to prepare their budgets and to maintain funds.

৩য় পরিচ্ছেদ– স্হানীয় শাসন

৫৯।-(১) আইনানুযায়ী নির্বাচিত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত প্রতিষ্ঠান সমূহের উপর প্রজাতন্ত্রের প্রত্যেক প্রশাসনিক একাংশের স্হানীয় শাসনের ভার প্রদান করা হইবে।

(২) এই সংবিধান ও অন্য কোন আইন সাপেক্ষে সংসদ আইনের দ্বারা যেরূপ নির্দিষ্ট করিবেন, এই অনুচ্ছেদের (১) দফায় উল্লিখিত অনুরূপ প্রত্যেক প্রতিষ্ঠান যথোপযুক্ত প্রশাসনিক একাংশের মধ্যে সেইরূপ দ্বায়িত্ব পালণ করিবেন এবং অনুরূপ আইনে নিম্নলিখিত বিষয় সংক্রান্ত দায়িত্ব অন্তর্ভূক্ত হইতে পারিবেঃ

(ক) প্রশাসন ও সরকারী কর্মচারীদের কার্য;

(খ) জনশৃংখলা রক্ষা;

 

(গ) জনসাধারণের কার্য ও অর্থনৈতিক উন্নয়ণ-সমপর্কিত পরিকল্পনা-প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন।

৬০।-এই সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদের বিধানাবলীকে পূর্ণ কার্যকরতাদানের উদ্দেশ্যে সংসদ আইনের দ্বারা উক্ত অনুচ্ছেদে উল্লিখিত স্হানীয় শাসন-সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানসমূহকে স্হানীয় প্রয়োজনে কর আরোপ করিবার ক্ষমতাসহ বাজেট প্রস্তুতকরণ ও নিজস্ব তহবিল রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষমতা প্রদান করিবেন।

   

তুলনামূক বিবরণীতে দেখা যাচ্ছে, (ক) “Local Government” –কে বাংলায় ‘স্হানীয় সরকার’ না বলে ‘স্হানীয় শাসন’ বলা হয়েছে।

(খ) “shall be entrusted to bodies”- কে “স্হানীয় শাসনের ভার প্রদান করা হইবে” রূপে অনুবাদ করা হয়েছে। অথচ প্রজাতন্ত্রের প্রত্যেক প্রশাসনিক একাংশের স্হানীয় সরকারের ভারার্পণের বিষয়টি এখানে অভিব্যক্ত হয়েছে। “স্হানীয় শাসনের ভার” আর “স্হানীয় সরকারের ভার” এ দুটোর মাঝে বিস্তর তফাৎ রয়েছে। স্হানীয়ভাবে সরকারের কাজগুলো করার জন্য স্হানীয় সরকার। এটা একটা আবশ্যিক বিষয়। এ কাজের কর্তাগণ অবশ্যই সরকারী কর্মকর্তা। অপরদিকে, “স্হানীয় শাসনের ভার প্রদান করা হবে”-এরূপ ভাবে উপস্হাপনার ক্ষেত্রে পেছনের অর্থটিতে সামগ্রিকতা বা স্বয়ংসম্পূর্ণতা অনুপস্হিত। এটা নির্বাহী বিভাগের অধীনস্হ সরকারী কাজ করার জন্য স্বয়ংক্রিয় একটি সরকারী অঙ্গ-এটা বর্তমান ব্যবস্হায় এখনো মানা হচ্ছেনা। সংবিধানের এরূপ ভুল উপস্হাপনার পশ্চাতের কারণটা সেখানেই।

(গ) “confer powers on the local government bodies referred to in that article, including power to impose taxes for local purposes, to prepare their budgets and to maintain funds.”- এর অনুবাদ করা হয়েছে এরূপেঃ

“উক্ত অনুচ্ছেদে উল্লিখিত স্হানীয় শাসন-সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানসমূহকে স্হানীয় প্রয়োজনে কর আরোপ করিবার ক্ষমতাসহ বাজেট প্রস্তুতকরণ ও নিজস্ব তহবিল রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষমতা প্রদান করিবেন।“

লক্ষ্য করলে যে কেউ সহজেই বুঝতে পারবে যে, মহান সংবিধানের বঙ্গানুবাদে এরূপ জঘণ্য অর্থ বিভ্রাটের ঘটণা কাদের স্বার্থ উদ্ধারের প্রয়াস ও এতে কারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এ ক্ষতি পূরণযোগ্য কি-না? উপরে উদ্ধৃত্ত তিনটে বিষয়ের যথাক্রমিক পর্যালোচনায় বের হয়ে আসে আসে যে- (ক) আমলাতান্ত্রিক আভিজাত্যবোধ স্বাধীন দেশের এ মহান সংবিধানের বিধান মোতাবেক স্হানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রায় দুযুগ সময় ধরে প্রশাসনিক একাংশ হিসেবেই মেনে নেয়নি। আর স্হানীয় সরকার হিসেবে এখনো মানতে পারছে বলে মনে হচ্ছে না। কারণ এসকল প্রতিষ্ঠান চলার জন্য যতো বিধিমালা বা পরিপত্রাদি তাদের হাত ধরে জারী হয়েছে বা হচ্ছে, সেগুলো দেখলে মনে হয় স্হানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানেরকার্য সরকারী কার্য নয় এবং এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীগণ সরকারী চাকরী করেননা। তারা ভুলে যান সংবিধানের প্রাধান্যঃ

“৭। (১) প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ; এবং জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ কেবল এই সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্বে কার্যকর হইবে।

(২) জনগণের অভিপ্রায়ের চরম অভিব্যক্তিরূপে এই সংবিধান প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন এবং অন্য কোন আইন যদি এই সংবিধানের সহিত অসমঞ্জস হয়, তাহা হইলে সেই আইনের যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ, ততখানি বাতিল হইবে।”

স্হানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে জনগণের নির্বাচিত জন প্রতিনিধিগণও উপযুক্ত মর্যাদা ও সাংবিধানিক  ভাবে সরকারী দায়িত্ব পালণের ক্ষেত্রে উপযুক্ত সম্মান, সম্মানী বা সুযোগ সুবিধা (Logistic Supports) কোনটাই যথাযথ ভাবে পাচ্ছেন না তাদের হাত ঘুরে। সরকারের নীতি নির্ধারণে তাদের প্রভাব ও ভুলকে শুদ্ধ বানিয়ে চাপিয়ে দেয়ার দক্ষতা তাদের একটু বেশীই। যাহোক, স্হানীয় উন্নয়ণ প্রশাসনকে এখন শক্তিশালী করতে না পারলে কার্যকর রাষ্ট্রকাঠামো গড়ে উঠবে না। পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্হিতিতে টিকে থাকার জন্য স্হানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে আর পরাধীন না রেখে যথাযথ স্বীকৃতি প্রদানের মাধ্যমে ক্ষমতায়ন, জাতীয় উন্নয়ণ বাজেটের সাথে সমন্বিতভাবে স্হানীয় উন্নয়ণ বাজেটের অর্থ সংস্হান এবং উন্নয়ণ প্রশাসনকে আরো দক্ষ, সমর্থবাণ, গতিশীল ও যুগযোপযুগী করে গড়ে তোলা প্রয়োজন।

(খ) প্রজাতনত্রের নির্বাহী বিভাগের সকল অংশ ও কার্য যথাক্রমে সরকারের অংশ সরকারী কার্য। স্হানীয় সরকার সংবিধানের চতুর্থ ভাগ নির্বাহী বিভাগেরই অন্তর্গতঃ

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান

চতুর্থভাগ- নির্বাহীবিভাগ

১ম পরিচ্ছেদ – রাষ্ট্রপতি
২য় পরিচ্ছেদ – প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভা
২ক পরিচ্ছেদ – (বাতিলকূত)
৩য় পরিচ্ছেদ – স্থানীয় শাসন [যা প্রকৃতপক্ষে “স্হানীয় সরকার” হইবে]
৪র্থ পরিচ্ছেদ – প্রতিরক্ষা কর্মবিভাগ
৫ম পরিচ্ছেদ অ্যাটর্ণি -জেনারেল

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রত্যেক প্রশাসনিক একাংশে স্হানীয় সরকারগুলো জাতীয় সরকারেরই অঙ্গ। অনেকগুলো অঙ্গ মিলে যেমন দেহ গঠিত তেমনি রাষ্ট্রের স্হানীয় সরকারগুলোর সমষ্টিই জাতীয় সরকার। দেহের কোন একটি অংগহানি যেমন দেহকে অসূস্হ্য বা অচল করে ফেলে, স্হানীয় সরকার ব্যবস্হা পরিপূর্ণতা না পেলে তেমনি রাষ্ট্র কার্যকরভাবে সচল থাকতে পারে না। আবার স্হানীয় সরকারের কার্যাদি সুষ্ঠুভাবে সম্পাদণের জন্য জাতীয় সরকারের মতো মাথাভারী জনবল না হোক অন্ততঃ পরিমিত জনবল কাঠামো, সাদৃশ্যপূর্ণভাবে বেতন কাঠামো, উপযুক্ত পদ্ধতিতে নিয়োগ, পদোন্নতি প্রশিক্ষণ ইত্যাদির সুব্যবস্হা করা অত্যাবশ্যক। এখানে আবার নমঃশূদ্র ব্রাহ্মণের পার্থক্য টানা যাবে না। কারন তারা জনগণের অতি কাছাকাছি থেকে সরাসরি জবাবদিহীতার মাধ্যমে রাষ্ট্রের প্রকৃত সেবার কাজগুলো করে থাকে। অনেকেই আবার নিজেদের মাধ্যমে অর্জিত রাজস্ব থেকে নিজের বেতনভাতা  আহরণ করে।

(ঘ) সংবিধানের ৬০ নং অনুচ্ছেদের বর্ণিত অংশের বাংলা অনুবাদৃষ্টে মণে হয়, যে অনুচ্ছেদটির ইংরেজি শিরোণাম “Powers of local government bodies” -এর বঙ্গানুবাদের কাজটি সত্যি অসহনীয় কাজ ছিলো। আর তাই অনেকটা নির্লজ্জ ভাবেই কাঁচি চালিয়ে ইচ্ছেমত ক্ষমতা নামক পৈত্রিক ধনটুকু কেটে রাখা হয়েছে। এ অনুচছেদের ইংরেজি অংশে পরিষ্কার ভাবে বলা হয়েছে –

“অনুচ্ছেদ ৫৯ এর বিধানাবলীকে পরিপূর্ণ কার্যকরীতাদানের উদ্দেশ্যে সংসদ, আইন দ্বারা, স্হানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান সমূহের উপর উক্ত অনুচ্ছেদে নির্দেশিত সকল প্রকার ক্ষমতা প্রদান করিবেন, সেই ক্ষমতা সহ যাতে স্হানীয় উদ্দেশ্য সমূহ পরিপূরণের নিমিত্তে উহাদের বাজেট তৈরী করা এবং তহবিল সমূহ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কর আরোপ করিতে পারে।”

স্হানীয় সরকারের ক্ষমতা সম্পর্কে সংবিধানে উপরে বর্ণিত সম্মানজনক ব্যাপকতা নস্যাৎ করে যে বিকৃত অর্থ করা আছে তা পাঠকগণ নিম্নে দেখলেই বুঝতে পারবেন, কেন এদেশে স্হানীয় সরকার ব্যবস্হা এতোদিনেও মাথা উঁচূ করে দাঁড়াতে পারছে না।

“৬০।-এই সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদের বিধানাবলীকে পূর্ণ কার্যকরতাদানের উদ্দেশ্যে সংসদ আইনের দ্বারা উক্ত অনুচ্ছেদে উল্লিখিত স্হানীয় শাসন-সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানসমূহকে স্হানীয় প্রয়োজনে কর আরোপ করিবার ক্ষমতাসহ বাজেট প্রস্তুতকরণ ও নিজস্ব তহবিল রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষমতা প্রদান করিবেন।”

বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের আমলে অশা করা যায় এ বিষয়গুলো ভালভাবে গুরুত্বের সাথে পরীক্ষা ণিরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় সংস্কার সাধনের মাধ্যমে স্হানীয় সরকার ব্যবস্হাকে শক্তিশালী করবেন এবং এর মধ্য দিয়ে গতিশীল উন্নয়ণ প্রশাসন আত্মপ্রকাশ করবে। তখন দেশ সুষম ও জবাদিহিমূলক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে দ্রুত অগ্রগতি ও উন্নয়ণের পথে এগুতে পারবে।

-মোঃ সামসুল আলম।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

w

Connecting to %s

%d bloggers like this: