স্থানীয় সরকারের পৌর প্রশাসনকে শক্তিশালী ও গতিশীল করার জন্য চেতণার উন্মেষ ঘটানোর প্রচেষ্টা

নগর প্রশাসনে সংস্কার জরুরী


প্রসঙ্গঃ সুশাসন ও স্হানীয় শাসন

নগর প্রশাসনে সংস্কার জরুরী

দেশের টেকসই সুষম উন্নয়ণ ও জনসেবা নিশ্চিত করতে সরকারের প্রশাসনিক সংস্কারের কাজটি এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। চল্লিশ বছর পার করেও স্বাধীনতার সুফলগুলো জনগণ যেসব কারণে কাঙ্খিতরূপে লাভ করতে পরেনি তার অন্যতম হলো বৃটিশ পাকিস্তানীদের রেখে যাওয়া প্রশাসনিক ব্যবস্হা আঁকরে ধরে রাখা। দেশের প্রকৃত উন্নয়ণ ও জনসেবার জন্য স্বাধীন দেশে যেরূপ প্রশাসনযন্ত্র গড়ে তোলা দরকার ছিল তাতে মনোযোগী না হয়ে ঔপনিবেশিক শোষনের হাতিয়ার হিসেবে পরিচিত প্রশাসনিক পদ্ধতি ও বিধি বিধানগুলো আজো গোষ্ঠীস্বার্থে বহাল রেখে যথেচ্ছা ব্যবহারের প্রবনতা লক্ষ্য করা যায়। অনেক ক্ষেত্রে সার্বভৌম সংবিধানও অনুসৃত হয় না। এ কারণেই সরকারযন্ত্রের কাছে জিম্মি ও বঞ্চিত জনগণের ক্ষোভ বিক্ষোভের মাত্রা দিন দিন বাড়ছে। সরকারে আসা রাজনৈতিক শক্তিগুলোর ভূমিকাও এক্ষেত্রে জনস্বার্থের অনুকূলে তেমন ইতিবাচক বা ফলপ্রসূ হতে কখনো দেখা যায়নি। এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনায় না যেয়ে দেশের নীতি নির্ধারকদের কাছে আশা করবো, তাঁরা একটি আধুনিক কল্যাণ রাষ্ট্র গঠনের মানসে কালবিলম্ব না করে সংবিধান অনুসারে জনপ্রতিনিধিত্ব সম্পন্ন ও প্রকৃত জনবান্ধব সরকার ব্যবস্হা গঠন করবেন এবং স্বাধীন দেশের স্বাধীন জনগণের উপযোগী করে প্রশাসনিক সংস্কার সাধনে নিরপেক্ষতার সাথে মনযোগী হবেন।

বর্তমান প্রজন্ম আধুনিক তথ্য প্রযুক্তির কল্যাণে এখন জ্ঞান বিজ্ঞানে অনেক বেশী সমৃদ্ধ ও অধিকার সচেতন। গোটা বিশ্বের সাথে তারা নীবিড় সম্পর্কজালে সংযুক্ত হয়ে নিজেদের গ্লোবাল ভিলেজের অধিবাসী করে নিয়েছে। সুতরাং সারা বিশ্বের প্রেক্ষিতে উন্নয়ণ ও সেবা প্রাপ্তির আপেক্ষিক বা তুলনামূলক বিচার বিশ্লেষণ ও তথ্য উপাত্ত তাদের নখদর্পণে। বিশ্ব প্রেক্ষিত বিবেচনায় তাদের সকল প্রত্যাশাও প্রমিত মানের। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতায় তারা জানে, টেকসই উন্নয়ণের জন্য সুশাসন অপরিহার্য এবং সুশাসন বলতে স্হানীয় সুশাসনকেই বুঝায়। স্হানীয় শাসনের অধিক্ষেত্রেই তারা বসবাস করে এবং প্রয়োজনীয় সেবা প্রত্যাশা করে। কেউ গ্রামে, কেউ নগরে, কেউ মহানগরে। এসব অধিক্ষেত্রে বিদ্যমান প্রশাসনযন্ত্রের কাছেই তারা যায় ও চায় প্রয়োজনীয় সকল নাগরিক সুবিধা। তাই কেন্দ্র হতে স্হানীয় সরকারের কাছে ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ এবং সারা দেশে সুষম ও শক্তিশালী স্হানীয় সরকার ব্যবস্হা গড়ে তোলার বিকল্প নেই। শক্তিশালী ও সুষম গনতান্ত্রিক স্হানীয় সরকার ব্যবস্হার মাধ্যমেই সরকারের জনবান্ধব নীতিকৌশল ও পরিকল্পনা জনগণের কাছে পৌঁছে দেয়া এবং নাগরিক সুবিধাদি যথাথভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব। সংবিধানের মৌলিক নীতি ও অভিপ্রায় অনুযায়ী এসকল স্তরে নর্বাচিত জনপ্রতিনিধিগনের কার্যকর নেতৃত্ব, স্হানীয় সরকারের প্রশিক্ষিত ও দক্ষ কর্মকর্তা কর্মচারীদের কার্য এবং সকল শ্রেণী পেশার জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে স্হানীয় সুশাসন। এ সকল প্রেক্ষাপটে এ মূহুর্তে সরকারের বিদ্যমান প্রশাসনিক ব্যবস্হার সংস্কার এবং জনগুরুত্ব বিবেচনায় নিম্নোক্ত বিষয়গুলো বিবেচনা ও কার্যকর ব্যবস্হা গ্রহণ জরুরীঃ

সুষম ও ভারসাম্যপূর্ণ অঞ্চল, মহানগর ও নগর বিণ্যাসঃ

বাংলাদেশে স্হানীয় সরকারের প্রস্তাবিত আঞ্চলিক কাঠামো
বাংলাদেশে স্হানীয় সরকারের প্রস্তাবিত আঞ্চলিক কাঠামো

দেশে বর্তমানে ৬৪টি জেলায় ৯টি সিটি কর্পোরেশন ও প্রায় ৩০৮টি পৌরসভা রয়েছে। এগুলো দেশের নগর স্হানীয় সরকার (Urban Local Government) কাঠামোভূক্ত প্রতিষ্ঠান। গ্রামীন স্হানীয় সরকার (Rural Local Government) কাঠামোয়  ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও জেলা পরিষদ-এরূপ স্তরবিণ্যাস করা হলেও নগর স্হানীয় সরকারে তা করা হয়নি। দেশে দ্রুত নগরায়ণের ফলে অধিক গুরুত্বপূর্ণ নগর স্হানীয় সরকার (ULG) প্রতিষ্ঠান সমূহের সুষম ও ভারসাম্যপূর্ণ স্তরবিণ্যাসের প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। নগর স্হানীয় সরকারের ক্ষেত্রে উপজেলা শহর, জেলা শহর ও মহানগর বা মেট্রোপলিটন সিটি-এরূপ স্তরবিণ্যাস করা যেতে পারে। নগর প্রশাসনে ক্ষমতার সুষম বিকেন্দ্রীকরণ, সম্পর্কজাল (Network) বিস্তরন ও সর্বদিক বিবেচনায় নিম্নোক্তভাবে গোটা দেশকে ১৩টি অঞ্চলে বিভক্ত করা যেতে পারে। ভৌগলিক অবস্হান, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, গ্রহণযোগ্যতা ও ইতিহাস-ঐতিহ্যের নিরীখে প্রতি অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ জেলা শহরকে সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত করে উহাকে আঞ্চলিক স্হানীয় নগর প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন স্তর হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে।

ক্রম

জেলা

বিদ্যমান পৌরসভা

ক্রম

জেলা

বিদ্যমান পৌরসভা

১।

গোপালগঞ্জ

০৪

১।

খুলনা

০২

২।

মাদারীপুর

০৩

২।

সাতক্ষীরা

০২

৩।

শরিয়তপুর

০৫

৩।

যশোর

০৮

৪।

ফরিদপুর

০৪

৪।

নড়াইল

০২

৫।

রাজবাড়ী

০৩

৫।

বাগেরহাট

০২

        মোটঃ

১৯

       মোটঃ

১৬

১।

বগুড়া

১১

১।

গাজীপুর

০৩

২।

গাইবান্ধা

০৩

২।

টাংগাইল

১০

৩।

জয়পুরহাট

০৫

৩।

নরসিংদী

০৬

৪।

সিরাজগঞ্জ

০৬

৪।

ব্রাক্ষ্মনবাড়ীয়া

০৪

       মোটঃ

২৫

মোটঃ

২৩

১।

ময়মনসিংহ

১০

১।

কুমিল্লা

১০

২।

কিশোরগঞ্জ

০৮

২।

চাঁদপুর

০৭

৩।

নেত্রকোনা

০৫

৩।

লক্ষ্মীপুর

০৪

৪।

জামালপুর

০৬

৪।

নোয়াখালী

০৮

৫।

শেরপুর

০৪

৫।

ফেণী

০৫

মোটঃ

৩৩

মোটঃ

৩৪

১।

রাজশাহী

১৫

১।

কুষ্টিয়া

০৫

২।

নাটোর

০৮

২।

মাগুরা

০১

৩।

নবাবগঞ্জ

০৪

৩।

ঝিনাইদহ

০৬

৪।

নওগাঁ

০৩

৪।

চূয়াডাংগা

০৪

৫।

পাবনা

০৯

৫।

মেহেরপুর

০২

  মোটঃ

৩৯

          মোটঃ

১৮

১।

নারায়ণগঞ্জ

০৩

১।

সিলেট

০৪

২।

মুন্সীগঞ্জ

০২

২।

মৌলভীবাজার

০৫

৩।

ঢাকা

০৩

৩।

সুনামগঞ্জ

০৪

৪।

মানিকগঞ্জ

০২

৪।

হবিগঞ্জ

০৬

মোটঃ

১০

মোটঃ

১৯

১।

বরিশাল

০৫

১।

চট্টগ্রাম

১১

২।

ঝালকাঠি

০২

২।

কক্সবাজার

০৪

৩।

পটুয়াখালী

০৫

৩।

খাগড়াছড়ি

০৩

৪।

পিরোজপুর

০৩

৪।

বান্দরবান

০২

৫।

বরগুনা

০৪

৫।

রাংগামাটি

০২

৬।

ভোলা

০৫

মোটঃ

২২

মোটঃ

২৪

 

১।

রংপুর

০২

২।

দিনাজপুর

০৮

৩।

ঠাকুরগাঁও

০৩

৪।

পঞ্চগড়

০২

৫।

নীলফামারী

০৪

৬।

লালমনিরহাট

০২

৭।

কুড়িগ্রাম

০৩

মোটঃ

২৪

উপরে প্রদর্শিত ১৩টি অঞ্চলের মাঝে ৮টি অঞ্চলেই মহানগর বা সিটি কর্পোরেশন বিদ্যমান রয়েছে। সম্প্রতি আলোচিত প্রতিটি পুরাতন জেলা শহরকে মহানগরে রূপান্তর না করে প্রস্তাবিত গোপালগঞ্জ, কুষ্টিয়া, বগুড়া, গাজীপুর ও ময়মনসিংহ-এ ৫টি গুরুত্বপূর্ণ জেলা শহরকে মহানগরে উন্নীত করাই অধিকতর সহজসাধ্য ও যৌক্তিক হবে। তাতে সময় ও রাজস্ব ব্যয়ের সাশ্রয় হবে। প্রতিটি অঞ্চলের মহানগরগুলো ঐ অঞ্চলের উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের নগর প্রতিষ্ঠানগুলোর আঞ্চলিক অভিবাবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারবে। এগুলোর কর্মী প্রশিক্ষন, নগর পরিকল্পনা, কারিগরী ও লজিস্টিক সহায়তা প্রদান এবং প্রাতিষ্ঠানিক সামর্থ্য বাড়াতে সাহায্য করবে। এছাড়া প্রতি অঞ্চলে অবস্হিত মহানগর প্রধানের নেতৃত্বে ঐ অঞ্চলের সকল নগরের জনপ্রতিনিধি সমন্বয়ে একটি আঞ্চলিক নগর স্হানীয় সরকার পরিষদ (Regional Council Of Urban Local Government-RCULG) গঠিত হতে পারে। সিটি কর্পোরেশন ভবনেই এর কার্যালয় থাকতে পারে এবং কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা পরিষদের সাচিবিক দায়িত্ব পালণ করতে পারবেন। দেশের ১৩টি আঞ্চলিক CULG প্রধান, রাজধানী শহর (Mega City) ঢাকার মেয়র ও এর আঞ্চলিক প্রধানগণ (যদি নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি থাকেন) এবং স্হানীয় সরকার মন্ত্রীর সমন্বয়ে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে গঠিত হতে পারে একটি জাতীয় নগর স্হানীয় সরকার পরিষদ (National Council Of Urban Local Government – NCULG)। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়/বিভাগের মন্ত্রীগণ (যেমনঃ অর্থ, পরিকল্পনা, গণপূর্ত, বিদ্যুৎ, শিক্ষা, সমাজ কল্যান, সংস্কৃতি ইতাদি) এ পরিষদের সদস্য হবেন। এর একটি আলাদা কার্যালয় ও লোকবল কাঠামো থাকতে হবে। কেবিনেট সচবের পদমর্যাদার একজন সচিব NCULG’র সাচিবিক দায়িত্ব পালন করবেন। আঞ্চলিক ও জাতীয় CULG ‘র কার্যাবলী সরকার নির্ধারণ করে দেবে।

অপরদিকে প্রদর্শিত ১৩টি অঞ্চলের মাঝে কেন্দ্রীয় সরকারের বিদ্যমান ৭টি প্রশাসনিক বিভাগের (Division) অতিরিক্ত নতুন ৬টি বিভাগ গঠন করে বিভাগ সমূহকে পূণর্বিণ্যাসের মাধ্যমে সরকারের মাঠ প্রশাসনেও সুষম ও অধিকতর ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ সম্ভব হবে। এছাড়া অনুরূপভাবে গঠিত হতে পারে ১৩টি আঞ্চলিক গ্রামীণ স্হানীয় সরকার পরিষদ (Regional Council Of Rural Local Government-RCRLG) ও একটি জাতীয় গ্রামীণ স্হানীয় সরকার পরিষদ (National Council Of Rural Local Government – NCRLG)। আঞ্চলিক CRLG গুলো প্রতি অঞ্চলের ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানগণের সমন্বয়ে গঠিত হতে পারে। এর সদস্যগণের মাঝ থেকে নির্বাচনের মাধ্যমে অথবা সরকার কর্তৃক দায়িত্ব প্রদত্ত একজন সংসদ সদস্যের (প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায়) নেতৃত্বে উহার কার্য পরিচালিত হতে পারে। বর্তমান বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় আঞ্চলিক CRLG’র কার্যালয়ে রূপান্তরিত করা যেতে পারে। বিভাগীয় কমিশনার পরিষদের সাচিবিক দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। জাতীয় গ্রামীণ স্হানীয় সরকার পরিষদও প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে গঠিত হতে পারে।

স্হানীয় সরকারের চাকুরী (Service) সমূহ পূণর্গঠনঃ

গ্রামীণ স্হানীয় সরকার (RLG) প্রতিষ্ঠান ও নগর স্হানীয় সরকার (ULG) প্রতিষ্ঠান সমূহের সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য আলাদা দুটি পূর্ণাংগ চাকুরী কাঠামো পূনর্গঠণ ও উপযুক্ত পদ্ধতিতে নিয়োগের ব্যবস্হা করতে হবে। এসব সার্ভিসের নিয়মিত পদে প্রেষণে লোকবল নিয়োগ বন্ধ করতে হবে। এজন্যে এ সার্ভিস দুটোর জন্য আলাদা নতুন ক্যাডার চালু করা যেতে পারে। স্হানীয় সরকারের নিজস্ব এসব ক্যাডারের প্রশাসনিক ও পেশাদারী পদসমূহে কর্মকর্তা নিয়োগ করা হলে বাস্তবিক সুফল পাওয়া যাবে। স্বল্প সময়ের জন্য ভিন্ন ক্যাডারের প্রেষণে নিযুক্ত কর্মকর্তা দ্বারা এসব প্রতিষ্ঠানের কাঙ্খিত ও টেকসই সুফল পাওয়া সম্ভব নয়। কাজের প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্য বিচারে কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মকর্তা-কর্মচারীগণ কেন্দ্রে থেকে সরকারের নীতিমালা, বিধি বিধান প্রনয়ণ ও নিয়ন্ত্রণমূলক (সরকারী আদেশ নির্দেশ জারীকরণ, পরিদর্শন, পরিবীক্ষণ, মূল্যায়ন ইত্যাদি) কার্য সম্পাদন করবেন। আর স্হানীয় সরকারের কর্মকর্তা-কর্মচারীগণ সরকারের নীতি-নির্দেশনা অনুসরণে স্হানীয় পর্যায়ে জনগণের কাছে থেকে উন্নয়ণ ও সেবামূলক কার্যাদি নিষ্পন্ন করবেন। তাঁরা স্বীয় খাতের সকল স্তরের প্রতিষ্ঠানসমূহে পদোন্নতি ও বদলীযোগ্য হবেন। স্ব-স্ব পেশায় ব্যাপক প্রশিক্ষনের সুযোগ থাকবে। কেন্দ্রীয় কোষাগার থেকে তারা বেতনভাতা আহরণ করবেন এবং অবসরে (Retirement) যাবার পর পেনশন ভোগ করবেন। হাওলাতি জনবল নয়, স্বীয় পেশায় অভিজ্ঞ স্হানীয় সরকারের নিজস্ব কাঠামোয় প্রতিষ্ঠিত দক্ষ জনবল দ্বারাই সর্বোত্তম জনসেবা প্রদান সম্ভব হবে। প্রয়োজনে স্হানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহ উহাদের কর্মকর্তা-কর্মচারীগণের বেতনভাতা সংক্রান্ত সকল তহবিল ও চাঁদা কেন্দ্রীয় কোষাগারে প্রদান করতে পারবে। ভুলে গেলে চলবে না, জনগণের দ্বারাই সরকার, জনগণের জন্যই সরকার আর স্হানীয় সরকারই জনগণের কাছের সরকার এবং আসল সরকার।

উপরের মূলনীতিসমূহের উপর ভিত্তি করে এ দুখাতে বিদ্যমান চাকুরী কাঠামোর পূনর্বিণ্যাস ও সার্ভিসসমূহ পূনর্গঠন করতে হবে। এক্ষেত্রে শুধুমাত্র আলাদা জনবল কাঠামো ও নিয়োগ বিধিমালা প্রনয়ণ করে বাংলাদেশ সার্ভিস রুলস (BSR) অনুসারে তাঁদের চাকুরী নিয়ন্ত্রিত হতে পারে।

স্হানীয় সরকারের আইনসমূহের অধিনে অবিলম্বে বিধিমালাসমূহ প্রনয়ণঃ

বর্তমান সরকার ক্ষমতাসীন হবার পর জাতীয় সংসদে যুগোপযোগী করে স্হানীয় সরকারের আইনসমূহ (ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশন) পাশ করে প্রবর্তন করা হয়েছে। এরপর প্রায় দুবছর গত হলেও এ সময়ের মাঝে সরকার ঐসব আইনের অধীন অতি প্রয়োজনীয় বিধিমালাসমূহ প্রনয়ণে ব্যর্থ হয়েছে। তাতে নতুন আইনগুলোর সুফল থেকে জনগণ বঞ্চিত হচ্ছেন। ঐসব আইনে স্হানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহের গণতন্ত্রায়ন, জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা, আধুনিক তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার, সেবাকার্যে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানো, জনপ্রতিনিধি ও কর্মকর্তা কর্মচারীদের আচরণ নিয়ন্ত্রণ, জননিরাপত্তা, অর্থনৈতিক ও বানিজ্যিক কর্মকান্ডের প্রসার ইত্যাদি অগ্রসর কার্যাবলীর বিধান রাখা হয়েছে। বিভিন্ন জাতীয় ফোরামে স্হানীয় সরকার প্রতিনিধিবৃন্দ, বিশেষজ্ঞগণ, সুশীল সমাজের নেতৃবৃন্দ ও সংসদ সদস্যগণ এসব বিধিমালা প্রনয়ণের জন্য বহুবার সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেও অদৃশ্য কারণে আজো বিধি সমূহ প্রনয়ণ করা হয়নি। এ নিয়ে জনস্বার্থের বদলে গোষ্ঠীস্বার্থের অনেক নাটক জনগণ প্রত্যক্ষ করেছে। যা একদিন জনরোষের কারণ হয়ে উঠতে পারে। সুতরাং সকল প্রতিবন্ধকতা দূর করে স্হানীয় সরকার আইনের অধীন বিধি সমূহ অবিলম্বে প্রনয়ণের কার্যকর ব্যবস্হা গ্রহণ জনস্বার্থে অতীব জরুরী।

স্হানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহে দ্রুত e-Local Governance চালু করণঃ

জনগণের সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে স্হানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহে দ্রুত আধুনিক তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার এবং অনলাইন সেবা প্রদানের ব্যবস্হা করা না হলে বর্তমান প্রজন্মের কাছে এসকল প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা ও গ্রহণযোগ্যতা হারাতে হবে। জনগণের দোরগোরায় সহজে সেবা পৌঁছে দেয়া, স্বচ্ছতা, দূর্ণীতি কমিয়ে আনা, নিখুঁতভাবে কাজ সম্পাদন, ব্যয় ও সময় বাঁচানো, সুষ্ঠ অফিস ব্যবস্হাপনা, রাজস্ব ও অর্থ ব্যবস্হাপনা ইত্যাদি কার্যাবলী আধুনিক সফ্টওয়্যার, কম্পিউটার ও ইন্টারনেট প্রযুক্তির মাধ্যমে অনায়াসে নিশ্চিত করা যায়। স্হানীয় সরকারের প্রত্যেক খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কেন্দ্রীয়ভাবে ব্যবস্হাপনা-ওয়ারী একই ফরমেটের Management Software ও Web Tools সরবরাহ করে বাধ্যতামূলক ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে সার্থক e-Local Governance চালু সম্ভব হবে। সহজে ও স্বল্প সময়ে  চাহিদা মাফিক তথ্য, উপাত্ত, প্রতিবেদন ইত্যাদি সংগ্রহ ও প্রকৃয়াজাতকরণ, যাঁচাই, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ণ করা যাবে। স্হানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে সঠিক পরিকল্পনা প্রনয়ণের জন্য এগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফল বয়ে আনবে। সুতরাং সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার কর্মসূচীর আওতায় অগ্রাধিকার খাত হিসেবে বিবেচনা করে স্হানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহের লোকবলের জন্য ব্যাপক প্রশিক্ষণ, প্রয়োজনীয় হার্ডওয়্যার ও সফ্টওয়্যার সরবরাহ, দ্রুতগতির ইন্টারনেট সংযোগ, ওয়েব সাইট তৈরী ও সরকারী সার্ভারে ওয়েব হোস্টিং, প্রমিত মানের দরকারী ওয়েব টুলসের ব্যবস্হা করণ ইত্যাদি অপরিহার্য বিষয়। এসব কাজের জন্য প্রয়োজনে দাতাগোষ্ঠীর সাহায্য নিয়ে পৃথক প্রকল্প কর্মসূচীর মাধ্যমে সরকার তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারেন।

বিবিধঃ

       ক) পৌর এলাকার ভূমি উন্নয়ণ ও সরকারী খাস জমির মালিকানাঃ  কার্যতঃ মহাপরিকল্পনার মাধ্যমে পৌরসভার দায়িত্ব হলো এর অধিক্ষেত্রে অবস্হিত সকল ভূমির ব্যবহার (Land Use) এবং জনগনের ব্যবহার্য অবারিত ভূমির উন্নয়ণ (Land Development) ও রক্ষণাবেক্ষণ করা। কিন্তু পৌর এলাকার ভূমি উন্নয়ণ কর নিচ্ছে ভূমি মন্ত্রণালয়। আবার পৌর এলাকায় অবস্হিত রাস্তা-ঘাট, হাট-বাজার ইত্যাদি জনগণের অবারিত ব্যবহার্য ভূমির মালিকানা ভূমি মন্ত্রণালয়ের হওয়ায় এসবের যথার্থ উন্নয়ণ ও রাজস্ব আয় বর্ধক প্রকল্প গ্রহনে পৌর কর্তৃপক্ষ বাঁধাগ্রস্হ হয়ে থাকে। ফলে এসব ভূমির যথার্থ ব্যবহার না হয়ে দূর্নীতি ও শ্রীহানির কারণ ঘটে জনস্বার্থ বিঘ্নিত হচ্ছে। সুতরাং পৌর এলাকায় অবস্হিত সরকারী খাস জমির মালিকানা এবং পৌর এলাকার ভূমি উন্নয়ণ কর আদায়ের ক্ষমতা পৌর প্রতিষ্ঠানের কাছে ন্যস্তকরণ অত্যন্ত যৌক্তিক ও সময়ের দাবী।

       খ) পিপিপি (Public Private Partnership) পদ্ধতিতে কতিপয় জরুরী সেবার উদ্যোগঃ  চাহিদা বিবেচনায় পৌর প্রতিষ্ঠানগুলো উপযুক্ত উদ্যোক্তা/ উদ্যোক্তাদের সাথে পৌর এলাকায় পিপিপি পদ্ধতিতে গৃহায়ণ, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণ, সুপার মার্কেট নির্মাণ, ক্যাবল টিভি ও ইন্টারনেট সেবা, বর্জ্য ব্যবস্হাপণা, গণপরিবহণ, কারিগরী, কম্পিউটার ও আইসিটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্হাপন ও পরিচালনা, বিভিন্ন শিক্ষা ও স্বাস্হ্য সেবামূলক প্রতিষ্ঠান স্হাপন ও পরিচালনা, বৃক্ষরোপণ ইত্যাদি লাভজনক প্রকল্প গ্রহণ করতে পারে। এ নিমিত্তে সরকার পৌর প্রতিষ্ঠানগুলোকে জাতীয় নীতিমালার আলোকে উপযুক্ত গাইডলাইন ও সহায়তা প্রদান করতে পারেন।

       গ) পৌর তথ্যকেন্দ্র, গবেষণা ও প্রশিক্ষণঃ  সরকারের Access To Information (A2I) কর্মসূচীর আওতায় ইতোমধ্যে গ্রামীন স্হানীয় সরকারের ইউনিয়ন পরিষদে কম্পিউটার সরবরাহ, ইন্টারনেট সংযোগ ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্হা করে ইউনিয়ন তথ্যকেন্দ্র স্হাপন করা হয়েছে। জনগণ ইহার সুফল পেতে শুরু করেছে। এছাড়া প্রতিটি জেলা প্রশাসনের ওয়েবসাইট তৈরী, সরকারী সার্ভারে হোস্টিং, রক্ষণাবেক্ষন ও নিরাপত্তার ব্যবস্হা করা হয়েছে। পৌর বা স্হানীয় সরকারের নগর প্রতিষ্ঠানগুলোতেও উক্ত কর্মসূচীর আওতায় নগর তথ্যকেন্দ্র স্হাপন, প্রশিক্ষণ প্রদান এবং নিজস্ব ওয়েবসাইট তৈরী ও হোস্টিংয়ের অনুরূপ ব্যবস্হা গ্রহণ করা প্রয়োজন। এ তথ্য বাতায়নের মাধ্যমে বিশেষায়িত ও নগর উন্নয়ণ সংক্রান্ত গবেষণার উপাত্ত সহজলভ্য হবে জাতীয় ও বেসরকারী গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও দাতা সংস্হার কাছে যা স্হানীয় সরকারের উন্নয়ণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধির কাজে সহায়ক ভূমিকা রাখবে। নাগরিক সেবা গ্রহীতাগণও এর মাধ্যমে অনলাইন সেবার সুযোগ পাবেন। উল্লেখ্য যে, জাতীয় স্হানীয় সরকার ইনস্টিউট (NILG) কে শক্তিশালী করেও গ্রামীন ও নগর স্হানীয় সরকারের জন্য স্হায়ীভাবে এসব প্রযুক্তি, গবেষণা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্হা করা যেতে পারে। কিন্তু তা হবে সময় সাপেক্ষ। তবে NILG স্হানীয় গ্রামীণ ও নগর প্রশাসনে কর্মরত জনপ্রতিনিধি, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বুণিয়াদি, পেশাগত ও উন্নয়ণ প্রশাসন বিষয়ে ব্যাপকভাবে নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্হা নিতে পারে। এজন্যে এ প্রতিষ্ঠানটির গবেষণা ও প্রশিক্ষণ সক্ষমতা বাড়াতে সরকারের আর্থিক ও লজিষ্টিক সহায়তা প্রদান করতে হবে।

       ঘ) নগর উন্নয়ণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠাঃ  সরকারের উদ্যোগে বাংলাদেশ ব্যাকের অধীনে সরকার, নগর প্রতিষ্ঠান ও নগরবাসীর যৌথ অংশীদারীত্বে একটি নগর উন্নয়ণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। শেয়ারের অনুপাত সরকার নির্ধারণ করবেন। শেয়ার ও বন্ডের মাধ্যমে তহবিল সংগ্রহ করা যাবে। দেশের প্রতিটি নগর প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয় ভবনে ১টি করে, রাজধানী মেগাসিটির প্রতিটি আঞ্চলিক কার্যালয় ভবনে ১টি করে আপাততঃ এর শাখা থাকবে। তাতে আর্থিক প্রতিষ্ঠানটির ভৌত অবকাঠামোগত ব্যয় সাশ্রয় হবে এবং রাজস্ব আহরণে নগর প্রতিষ্ঠানগুলোরও সুবিধা হবে। নগরের স্হানীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ণ, কর্মসংস্হান ও নগর প্রতিষ্ঠানের আয়বর্ধক উন্নয়ণ খাতে বিণিয়োগই হবে এ ব্যাংক প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্য। এ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সাধারণ ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনায়ও বিশেষ সুবিধা পাওয়া যাবে। তবে সরকার বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে উপযুক্ত নীতিমালা, বিধি ও আইন দ্বারা উহা প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনার ব্যবস্হা গ্রহণ করতে পারেন। ইহার ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা, উপযোগীতা ও গ্রহণযোগ্যতা উজ্জ্বল।

    ঙ) নগর অধিক্ষেত্রে বাড়ীভাড়া নিয়ন্ত্রণঃ  নগর মহানগরে অনিয়ন্ত্রিত বাড়ীভাড়া বৃদ্ধির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত নগরবাসীর ক্ষোভ বিক্ষোভ রাজপথ পর্যন্ত গড়িয়েছে। নিয়ন্ত্রণহীন বাড়ীভাড়া প্রদানের সুযোগে সন্ত্রাসীদের আত্মগোপণ ও নিরাপদ কর্মকান্ড, ভেজাল ও অবৈধ ব্যবসা, নকল কারখানা ইত্যাদি অপরাধ প্রশ্রয় পাচ্ছে। রাজস্ব ফাঁকি সহ সরকারের ক্ষতি ও জননিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে। সুতরাং নগর অধিক্ষেত্রে সকল প্রকার বাড়ীভাড়া প্রদানের পূর্বে হোল্ডিংধারীকে ভাড়াগ্রহীতার প্রয়োজনীয় পরিচিতি, আনুসাংগীক তথ্য ও ভাড়ার হার নির্ধারিত ফরমে প্রদান ও সত্যায়ন করে সংশ্লিষ্ট নগর প্রতিষ্ঠানে দাখিল এবং যাঁচাইয়ান্তে ফি’র বিনিময়ে নিবন্ধন বা অনুমতি গ্রহণের বিধান থাকা দরকার। এ নিমিত্তে সরকার একটি বিধিমালা প্রনয়ণ করে তা বলবৎ করতে পারেন।

-মোঃ সামসুল আলম

তারিখঃ ০৩/০৯/২০১১ খ্রিঃ।

Advertisements

Comments on: "নগর প্রশাসনে সংস্কার জরুরী" (2)

  1. ভাই,
    আপনার লেখা আমার খুব কাজে লাগলো। আপনার লেখা পড়ে আমি বুঝতে পারলাম আপনি জীওগ্রাফার কিংবা পাবলিক এডমিনিস্ট্রাশনের নন, বরং আরবান প্ল্যানিং এর এক্সপার্ট। আমিও এর নগণ্য ছাত্র।

    আমার মেইল আই ডি দিচ্ছি এইখানে। প্লীজ যোগাযোগ করবেন। আপনার মেইল আই ডি নেই বিধায় আমি আপনার সাথে যোগাযোগ করতে পারছি না। আমি এখন থিসিস করছি যার বিষয় বস্তু আপনার লেখ্য বিষয়ের উপরই।
    প্লীজ যোগাযোগ করবেন।

    n_nabi123@yahoo.com

  2. অত্যন্ত সময়োপযোগী ও গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের এ বিষয়ে জরুরী ব্যবস্হা গ্রহণ আবশ্যক। লেখককে সাধুবাদ।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: