স্থানীয় সরকারের পৌর প্রশাসনকে শক্তিশালী ও গতিশীল করার জন্য চেতণার উন্মেষ ঘটানোর প্রচেষ্টা

ব্যবস্থা গ্রহণ অত্যাবশ্যক


প্রশাসনিক জটিলতা নিরসনের জন্য পৌরসভা চাকুরী কাঠামোয় ‘সচিব’ পদের সাংগঠনিক অবস্হান এবং বেতন-ক্রমের মান পূণঃ নির্ধারণের আশু ব্যবস্থা গ্রহণ অত্যাবশ্যক:

পৌরসভা একটি শহর ভিত্তিক সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। এ প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে ০৩(তিন)-টি কর্ম বিভাগ যথাঃ প্রশাসন বিভাগ, প্রকৌশল বিভাগ এবং স্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা ও পরিচ্ছন্নতা বিভাগ-এর মাধ্যমে কাজ সম্পাদন করে। উক্ত তিনটি বিভাগের মধ্যে কাজের সমন্বয় সাধনসহ কর নির্ধারণ, রাজস্ব আদায় (যথা-কর, ফি, রেট, টোল, সেস, লেভী, ইজারা ইত্যাদি), হিসাব রক্ষণা-বেক্ষন ও আয়ন-ব্যয়ন, শিক্ষাও সংস্কৃতি, উন্নয়ন এবং অফিস ব্যবস্থাপনার সার্বিক দায়িত্বপূর্ণ কাজটি সূচারুরূপে সম্পাদন করে থাকেন পৌর সচিব। এ জন্যেই একটি পৌরসভা প্রশাসনের সফলতা ও ব্যর্থতা বহুলাংশে ‘পৌর সচিব’ এর উপর নির্ভরশীল। পৌরসভায় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পৌর সচিবগণকে প্রাসঙ্গিক আইন-কানুন ও বিধি-বিধান সম্পর্কে ধারাবাহিক সম্যক ধারণা থাকতে হয়। অধিকন্তু, এ সকল আইন ও বিধিবিধান চর্চ্চা এবং প্রয়োগের ক্ষেত্রে মেয়র ও পৌর পরিষদকে আইন ও বিধি সম্মত পরামর্শ প্রদান এবং সভানুষ্ঠানে সাচিবিক দায়িত্ব পৌর সচিবকেই পালন করতে হয়।

পৌরসভা কার্য বিধিমালা, ১৯৯৯ এর ৯-নং বিধি মোতাবেক পৌরসভার মেয়রের অভিপ্রায় অনুযায়ী ‘সচিব’ পৌরসভার মেয়রের পক্ষে যে কোন দায়িত্ব পালনের জন্য ক্ষমতাপ্রাপ্ত হয়ে থাকেন। উক্ত বিধিটি হ’ল “পৌরসভার অনুমোদন সাপেক্ষে, মেয়র বিধি ৭ এ (মেয়র কর্তৃক কার্য নিষ্পন্ন করণ) কোন কার্যাবলী সম্পাদনের জন্য লিখিত আদেশ দ্বারা ‘প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা অথবা পৌরসভার ‘সচিব’ বা কোন বিভাগীয় প্রধানকে ক্ষমতা অর্পণ করতে পারবেন এবং অনুরূপ ক্ষমতা অর্পণ করা হলে ক্ষমতা প্রাপ্ত ব্যক্তি মেয়রের নির্দেশনার আলোকে উক্ত কার্য নিষ্পন্ন করবেন।”

পৌরসভার কর্মচারী চাকুবী বিধিমালা, ১৯৯২ এর ১৩(৪) বিধির ২(গ) উপ-বিধি অনুসারে একই সংস্থায় কর্মরত অন্যান্য বিভাগের বেতন-ক্রম সামঞ্জস্যপূর্ণ ভাবে তফসিলে বর্ণিত পদ গুলোর ক্ষেত্রে বজায় রাখার নির্দেশনা রয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়, অর্থ বিভাগ, বাস্তবায়ন ও প্রবিধি অনুবিভাগ এর ২০-০৮-২০০৫ খ্রিঃ তারিখের স্মারক নং- অম/অবি/বাস্ত-৩ (বিদু্ৎ-৩)-২০০৫/৬৯ এবং স্থানীয় সরকার বিভাগের ০৩-০৯-২০০৫ খ্রিঃ তারিখের স্মারক নং- প্রশাসন-১/ও-০১/২০০৫/১৯২৫/১(৩) অনুযায়ী মন্ত্রণালয়/ বিভাগের অধীনস্থ দপ্তর/ সংস্থার প্রকৌশলী এবং অ-প্রকৌশলী কর্মকর্তাদের মধ্যে বেতন বৈষম্য দূরীকরণের জন্য নির্দেশনা রয়েছে। উক্ত নির্দেশনা অনুযায়ী, পৌরসভায় বিভাগীয় প্রধান হিসেবে কর্মরত প্রকৌশলী এবং অ-প্রকৌশলী কর্মকর্তাদের মধ্যে বেতন-বৈষম্য দূরীকরণ করা ন্যায় বিচার (justice) নিশ্চিত করার জন্য অত্যাবশ্যক।

পৌরসভার কর্মচারী চাকুরী বিধিমালা, ১৯৯২ এর ৩-নং বিধি মোতাবেক প্রদর্শিত শ্রেণী বিন্যাসের আলোকে পৌরসভাগুলো ‘বিশেষ’, ‘ক’, ‘খ’ এবং ‘গ’ এ ০৪-টি শ্রেণীতে বিভক্ত এবং উক্ত বিধিমালার তফসিলে বর্নিত ২নং ক্রমিক অনুযায়ী পৌর সচিবগণের পদবী পৌরসভার শ্রেণী বিন্যাসের সাথে সামঞ্জস্য রেখে যথাক্রমে ‘বিশেষ’, ‘ক’, ‘খ’ এবং ‘গ’ শ্রেণী হওয়া বাঞ্চনীয় ও যুক্তিযুক্ত।

বিগত ১৯৮৮ সালে তৎকালীন কথিত স্বৈর-শাসনামলে পৌরসভা অধ্যাদেশ, ১৯৭৭ এর ৪০-নং ধারার সাথে সাংঘর্ষিক ৪২-নং ধারাটি অন্তর্ভূক্তি দ্বারা ‘প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা’ পদ সৃষ্টি করায় এবং পরবর্তীতে ১৯৯৪ খ্রিঃ ও ২০০২ খ্রিঃ সালে ‘সচিব’ পদের অধঃস্তন বিভিন্ন শাখা প্রধানের (যেমন-হিসাব রক্ষন কর্মকর্তা, উপ-সহকারী প্রকৌশলী) পদমর্যাদা ও বেতনক্রম উন্নীত করায় এবং তদপ্রেক্ষীতে ‘সচিব’ পদের পদমর্যাদা ও বেতনক্রমের মান প্রচলিত আইন ও বিধি মোতাবেক সামঞ্জস্য রেখে পুনঃনির্ধারন না করায় কার্যতঃ এ পদের গুরুত্ব ও মর্যাদা অস্বাভাবিকভাবে অবনমিত হয়েছে। সাংগঠনিক কাঠামোয় বিদ্যমান অদ্ভূত বেতন-বৈষম্যের কারণে পৌর প্রশাসনে অবাঞ্চিত বিশৃংখল পরিস্থিতির উদ্ভব হয়ে তা দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা, রীতি অনুপালন ও প্রশাসনিক উন্নয়নের পথে সুস্পষ্ট প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। মেধাবীরা এ পদের চাকুরীতে আসছে না এবং যারা এসেছে তারা দৈন্যাবস্হা দেখে চাকুরী ছেড়ে চলে যাচ্ছে।

পৌরসভায় কর্মরত ‘বিশেষ’, ‘ক’, ‘খ’ এবং ‘গ’ শ্রেণীর “সচিব” পদবী ধারীদের বেতন-ক্রম ও পদমর্যাদার অসংগতি দূরীকরণ, সাচিবিক দায়িত্ব পালনে বিব্রতকর পরিস্থিতি পরিহার এবং প্রশাসনিক জটিলতা নিরসনের নিমিত্তে অন্যান্য বিভাগীয় প্রধানদের সাথে বেতন-ক্রমের ও পদমর্যদার সামঞ্জস্যতা আনয়ন করা অপরিহার্য। এক্ষেত্রে গ, খ, ক ও বিশেষ শ্রেণীর পৌর সচিবদের বেতন-ক্রম যথাক্রমে ১১তম, ৬ষ্ঠ, ৫ম ও ৪র্থ গ্রেডের হওয়া বাঞ্ছণীয়। এ নিমিত্তে পৌর সচিবগণের দীর্ঘদিনের ন্যায্য দাবী সম্বলিত আবেদন বিবেচনা অপরিহার্যভাবেই জরুরী ও গুরুত্বপূর্ণ। পৌর প্রশাসনকে বিপর্যয়ের পথ থেকে রক্ষা ও যথাযথ চেইন-অব-কমান্ড প্রতিষ্ঠার জন্যই তা আবশ্যক।

এছাড়া আইনের অভিব্যক্তি অনুযায়ী সচিব পদটি সর্বস্তনিক ও নির্বাহী পদ বিধায় এ পদের সাংগঠনিক অবস্হান অবশ্যই অন্য সকল পদের উর্ধ্বে থাকবে। আইন দ্বারা সুনির্দ্দিষ্টকৃত ও সংজ্ঞায়িত কোন পদের পদমর্যাদা ও বেতনক্রম কখনো বা কোথাও বিধি দ্বারা বিনির্দ্দিষ্টকৃত পদের সমান বা নিম্নে হতে পারে না। যেহেতু পৌরসভা সার্ভিসে সচিব পদটি আইন দ্বারা সংজ্ঞায়িত(defined) [ধারা ২(৫৮) দ্রঃ], সুনির্দ্দিষ্টকৃত (specified) ও আবশ্যিক (mandatory) [ধারা ৪৩ দ্রঃ] সেহেতু এ পদের আইনী অবস্হান সুরক্ষা করা অপরিহার্য। এ ক্ষেত্রে পৌর সচিবগণের যৌক্তিক আবেদন বিবেচনা করে স্হানীয় সরকার বিভাগ উপযুক্ত বিধিমালা প্রনয়ণ করবেন এটাই সকলের প্রত্যাশা। এর ব্যত্যয় দ্বারা কোন বিধি প্রণীত হলে তা আইনী আশ্রয়ে প্রতিকারযোগ্য।

ভিশন ২০২১ এর লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে গুরুত্বপূর্ণ পৌর প্রশাসনকে অবশ্যই শক্তিশালী করে গড়ে তুলতে হবে। এ নিমিত্তে সরকার শক্তিশালী ও আধুনিক করে স্হানীয় সরকার (পৌরসভা) আইন, ২০০৯ প্রনয়ণ করেছেন। দীর্ঘ প্রায় তিন বছর গত হলেও আইন অনুযায়ী অদ্যাবধি গুরুত্বপূর্ণ বিধিমালা সমূহ প্রণীত না হওয়ায় আইনের সুফল হতে জনগণ বঞ্চিত হচ্ছে। রুদ্ধ হয়ে আছে আধুনিক ও শক্তিশালী পৌর প্রশাসন গঠণের প্রকৃয়া। এ জন্যে কে দায়ী অথবা কেন এ বিলম্বীকরণ-তা খতিয়ে দেখে জরুরী ব্যবস্হা গ্রহণ অত্যাবশ্যক।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: