স্থানীয় সরকারের পৌর প্রশাসনকে শক্তিশালী ও গতিশীল করার জন্য চেতণার উন্মেষ ঘটানোর প্রচেষ্টা

স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার উন্নয়ন ভাবনা


সরকারের ভিশন’ ২০২১ ও ২০৪১ বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জসমূহঃ
সহায়ক শক্তি হিসেবে অতি দ্রুত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে যা করণীয় ৷৷

গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক ন্যায় বিচার নিশ্চিত করার জন্য বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্রের কার্যক্রম পরিচালনার অন্যতম অংশ হিসেবে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহকে আইনগত ভিত্তি ও ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে ৷ বাংলাদেশের নগর ও শহর কেন্দ্রিক স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান হলো সিটি কর্পোরেশন এবং পৌরসভা ৷ পল্লী এলাকা কেন্দ্রিক স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান হল জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদ ৷ বর্তমানে দেশে ১১টি সিটি কর্পোরেশন ও ৩২৪টি পৌরসভা এবং ৬১টি জেলা পরিষদ, ৪৮৯টি উপজেলা পরিষদ ও ৪৫৫৯টি ইউনিয়ন পরিষদ রয়েছে ৷

শহর ও নগর এলাকা অকৃষিপ্রধান এবং ঘণবসতিপূর্ণ আর পল্লী এলাকা হল কৃষিপ্রধান এবং সাধারনভাবে হালকা বসতির ৷ এ দু’এলাকায় জনগণের সেবা ও উন্নয়নের চাহিদা এবং ধরণ অনেকটাই আলাদা ৷ স্থানীয় শাসন ব্যবস্থার এ দু’সেক্টরেই নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিগণের মাধ্যমে সরকারের সেবা ও উন্নয়ন জনগণের দোরগোঁড়ায় পৌঁছে দেয়ার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে ৷ প্রশাসনিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের পাশাপাশি আমলাতন্ত্রের বিভিন্ন সার্ভিসের সদস্যগণ এখানে কাজ করেন ৷ জনপ্রতিনিধিদের নেতৃত্বে জনগণের খুব কাছে থেকে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহে তারা একনিষ্ঠভাবে সরকারের নীতিনির্দেশনা বাস্তবায়নের গুরুদায়িত্ব পালণ করেন ৷ জনগণের কল্যাণের জন্য স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী করার পাশাপাশি এসব প্রতিষ্ঠানের চাকরি কাঠামো তথা সার্ভিস সমূহের যথাযথ পূণর্বিণ্যাস ও পূণর্গঠন বা সংস্কার দ্বারা শক্তিশালীকরণ আবশ্যক ৷

স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার জন্য বহু পূর্বেই আইনের ভিত্তি প্রস্তুত করা হয়েছে ৷ অর্থাৎ সরকার সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদ- সবকটি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রায় ৫/৬ বছর আগেই যুগোপযোগী আইন প্রণয়ন করেছে ৷ কিন্তু এসব আইনের বিধানসমূহ সার্বিক বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় সব বিধিমালা আজো প্রণয়ন করা হয়নি ৷ ফলে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্য সম্পাদন এখনো কাঙ্খিত রূপে সক্ষম, স্বচ্ছ, সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট হতে পারেনি ৷

সারাদেশে সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদসমূহ নাগরিক সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি, সেবা প্রদান ও বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে ৷ পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোর দৃষ্টান্ত এবং দেশের সাংবিধানিক অভিপ্রায় অনুযায়ী আমাদের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহ এদের অনেক দায়িত্বই হাতে পায়নি- যেসব এখনো কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে রয়ে গেছে ৷ সরকারের ভিশন’ ২০২১ ও ২০৪১ বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক শক্তি হিসেবে এসব প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বৃদ্ধিকরণ এবং তজ্জন্যে উহাদের জনবল কাঠামোকে যথাযথ পর্যাপ্ত, দক্ষ ও শক্তিশালী করণের কোন বিকল্গ নেই ৷

সরকারের কার্য সম্পাদন প্রকৃয়ায় জনপ্রতিনিধিগণ সিদ্ধান্ত গ্রহন, নীতি নির্ধারণ ও নেতৃত্বের ভূমিকায় থাকেন ৷ কিন্তু বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা নির্বাহী জনবল কাঠামো সামর্থ্যবান, দক্ষ, শক্তিশালী ও নিবেদিত না হলে সরকার ব্যর্থ হতে বাধ্য ৷ সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদে বর্ণিত স্থানীয় সরকারের ধারণা অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানের উপর প্রজাতন্ত্রের প্রত্যেক প্রশাসনিক একাংশের স্থানীয় শাসনের ভার প্রদান করা হবে ৷ কিন্তু এখনো দেশের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহের জনবল কাঠামো বা সার্ভিস সমূহকে ওভাবে উন্নীত করা হয়নি ৷ ইউনিয়ন পরিষদেতো অফিস চালানোর মত ন্যূনতম জনবলই নেই ৷ জেলা পরিষদ ও উপজেলা পরিষদ অধিক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সরকারের ন্যস্ত জনবলই কার্য সম্পাদন করছেন ৷ জেলা পরিষদের জনপ্রতিনিধিই এখনো নির্বাচন করা যায়নি ৷ এখানে স্থানীয় সরকারের ক্ষমতাও অবমূক্ত হয়নি ৷ আর সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভা এদিক দিয়ে একটু এগিয়ে থাকলেও এদুটি প্রতিষ্ঠানের সার্ভিসে জনবল নিয়োগ, ব্যবস্থাপনা এবং চাকরির নিরাপত্তা, মান-মর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা নিম্নমানের ৷ তা এতোটাই বঞ্চণা ও বৈষম্যে ভরা এবং অসঙ্গতিপূর্ণ যে, মেধাবীরা এখানে আসতেই চান না; যারাও বা আসেন, যোগ্যরা দ্রুত সটকে পড়েন ৷ বক্ষমান অসঙ্গতিগুলোর কিছু ফিরিস্তি নিচে তুলে ধরা হলঃ

ক. সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভা সার্ভিসের গুরুত্বপূর্ণ ও নির্বাহি পদগুলো প্রেষণে ভিন্ন সার্ভিসের লোকবল দ্বারা পূরণের বিধান রেখে মূল সার্ভিসের কাঙ্খিত ফিডার জনবলের পদোন্নতির পথ রুদ্ধ করা হয়েছে ৷ কর্মচারীদের পদোন্নতির সুযোগ নেই বললেই চলে ৷

খ. এসব প্রতিষ্ঠানের সাংগঠনিক কাঠামোর একই সমান্তরালে রাখা প্রশাসন বিভাগ, প্রকৌশল বিভাগ ও স্বাস্থ্য বিভাগের বেতনস্কেল ও পদমর্যাদায় প্রকট বৈষম্য ও অসামঞ্জস্যতা বিদ্যমান রাখা হয়েছে ৷ এতে নানা জটিলতাই শুধু হচ্ছে না, গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োজিত অনেক কর্মকর্তা হতোদ্দ্যম ও কর্মস্পৃহা হারাচ্ছেন।

গ. সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভা সার্ভিসে সরকারের অন্যান্য সার্ভিসের ন্যায় ক্যাডার চালু করা হয়নি; আইনসিদ্ধ এসব আরবান সার্ভিসের কর্মকর্তা নিয়োগও পিএসসি’র মাধ্যমে করা হয় না ৷ স্থানীয় প্রশাসনে যোগ্য কর্মকর্তা নিয়োগ ও পদোন্নতি প্রদানের জন্য এর বিকল্প নেই।

ঘ. সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভা সার্ভিসে কর্মরত কর্মকর্তাগণ সরকারের অন্যান্য সার্ভিসের ন্যায় চাকরিক্ষেত্রে বুণিয়াদি প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন প্রশিক্ষণ, সুপিরিয়র সার্ভিসে প্রবেশের সুযোগ, উচ্চতর গ্রেডে পদোন্নতির অধিকার, প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সাপোর্ট, পেনশন সুবিধা- ইত্যাদি মৌলিক প্রাপ্তিসমূহ থেকে বঞ্চিত ৷

ঙ. স্থানীয় শাসন ব্যবস্থার পল্লী-সেক্টরে কর্মরত বা ন্যস্ত কর্মকর্তাগণ বিভিন্ন ক্যাডার সার্ভিসভূক্ত বা গেজেটেড মর্যাদার হলেও অত্যাধিক গুরুত্বপূর্ণ আরবান-সেক্টরের মূল সার্ভিসে কর্মরতরা এসব মর্যাদা এবং তুলনামূলক সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত ৷

চ. সাংবিধানিক প্রশাসনিক ইউনিটের আইনসিদ্ধ সার্ভিস সদস্য হয়েও গেজেটেড-ননগেজেটেড, ক্যাডার-ননক্যাডার, পেনশনেবল-ননপেনশনেবল এসব অদ্ভুৎ বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তা কর্মচারীগণ ৷ চাকরি ও অবসরকালীন নিরাপত্তা ও মর্যাদা এখানে নির্মমভাবে অবদমিত ৷

ছ. একই প্রকৃতির প্রতিষ্ঠান ও কার্য নির্বাহ করে থাকে শহর ও নগর ভিত্তিক স্থানীয় সরকারের পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশন ৷ আসলে একটি পৌরসভা বৃহৎ কলেবরের যোগ্যতা ধারণ করে তা বিলুপ্ত হয়েই সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত হয় ৷ তখন, প্রাথমিকভাবে, ঐ বিলুপ্ত পৌরসভার কর্মকর্তা কর্মচারীগণই নবগঠিত সিটি কর্পোরেশনের আত্মীকৃত জনবলে পরিণত হন ৷ একমাত্র সচিব পদ ছাড়া বিলুপ্ত পৌরসভার সবাই স্বীয় পদে সিটি কর্পোরেশনের চাকরী কাঠামোয় আত্মীকৃত হতে পারেন ৷ আবার বদলী বা পদোন্নতির মাধ্যমে পৌরসভা সার্ভিস হতে সিটি কর্পোরেশনে প্রবেশের সুযোগ রাখা হয়নি ৷ অথচ সরকারের বিভিন্ন সার্ভিসে মাঠ পর্যায় থেকে অধিদপ্তর বা সচিবালয় পর্যন্ত এমনকি ভিন্ন সার্ভিসে প্রেষণে নিয়োগের এরূপ সুযোগ বিদ্যমান আছে ৷ চাকরিক্ষেত্রে এসব বৈষম্য, বঞ্চণা ও অসংগতি মেধাবী, সচেতণ ও যোগ্যদের হতাশ এবং নিরুৎসাহিত করে ৷

জ. স্থানীয় সরকারের প্রকৃত ধারণা অনুযায়ী স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোই এলাকার সকল নাগরিক সেবা, পরিচর্যা ও উন্নয়নের মৌলিক কাজগুলো করবে ৷ যারা কেন্দ্রিয় সরকারে কাজ করেন, তাঁরা এবং তাঁদের কর্মস্থল এবং আবাসস্থলও স্থানীয় সরকারের সেবার পরিধিভূক্ত ৷ অথচ এসব সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সার্ভিস সদস্যদের অনিরাপদ, মেরুদন্ডহীন ও বঞ্চনার চিত্র সুবোধ ও কল্যাণকামী কারো কাছে মঙ্গলজনক মনে হতে পারে না ৷

২০১১ সালের আদম শুমারী অনুযায়ী দেশের মোট জনসংখ্যা ১৪.৯৮ কোটি, এর মাঝে শহর ও নগর জনসংখ্যার পরিমান ৪.১৯ কোটি; অর্থাৎ প্রায় ২৮% মানুষ শহর ও নগরে বসবাস করে ৷ শহর ও নগরের জনসংখ্যা বছরে ৪.০১% হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং দ্রুত নগরায়ণের ফলে বর্তমানে এ সংখ্যা প্রায় ৩২% ৷ এর উপর প্রতিনিয়ত ব্যাবসা-বানিজ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা, কেনাকাটা ও কাজের জন্য আসা ভাসমান জনসংখ্যাসহ দেশের প্রায় ৪০% জনগোষ্ঠীর সেবা প্রদান করতে হয় নগর ও শহর ভিত্তিক স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে ৷

দেশের অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমও মূলতঃ শহর ও নগর ভিত্তিক ৷ ঘন-বসতি, জমি ও সম্পদের উচ্চ-মূল্য, উন্নত নাগরিক সুবিধা প্রভৃৃতি কারণে শহর ও নগর এলাকাই দেশের অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি ৷ জাতীয় উৎপাদনে শহর ও নগরের অবদান ৪৫% এর বেশী ৷ এই হার পল্লী অঞ্চলের তুলনায় নগর অঞ্চলের অধিক উৎপাদনশীলতার নির্দেশক ৷ অপরদিকে দ্রুত নগরায়নের ফলে বর্ধিত জনগোষ্ঠীর নাগরিক চাহিদা মেটানোর ক্ষেত্রে শহর ও নগরের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ৷ সুতরাং নগর ও শহর ভিত্তিক স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী ও যথার্থ কার্যকর করতে উহাদের সার্ভিস সদস্যদের চাকরির ক্ষেত্রে বিদ্যমান বঞ্চণা, অসমঞ্জস্যতা ও অব্যবস্থাপনা ইত্যাদি দূর করে সার্ভিসগুলোর মান উন্নয়ন করা অত্যন্ত জরুরী ৷

সংবিধানে প্রদত্ত সংজ্ঞায়ঃ ‘প্রজাতন্ত্র’ হল গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ ৷ ‘প্রজাতন্ত্রের কর্ম’ হল অসামরিক বা সামরিক ক্ষমতায় বাংলাদেশ সরকার-সংক্রান্ত যে কোন কর্ম, চাকরি বা পদ এবং আইনের দ্বারা প্রজাতন্ত্রের কর্ম বলে ঘোষিত হতে পারে, এরূপ অন্য কোন কর্ম ৷ ‘সরকারি কর্মচারী’ হল প্রজাতন্ত্রের কর্মে বেতনাদিযুক্ত পদে অধিষ্ঠিত বা কর্মরত কোন ব্যক্তি ৷ ‘প্রশাসনিক একাংশ’ হল জেলা কিংবা সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদের উদ্দেশ্য-সাধনকল্পে আইনের দ্বারা অভিহিত কোন এলাকা ৷ সুতরাং প্রজাতন্ত্রের নির্বাহি বিভাগের অধীন এরূপ প্রশাসনিক একাংশের কর্মে নিয়োজিতরা সরকারের অন্যান্য কর্মবিভাগের ন্যায় চাকরিগত মর্যাদা ও সুযোগ ভোগ করতে পারবেন না কেন ? এদের নিয়োগ ও কর্মের শর্তাবলীও তো সংবিধানের বিধানাবলী-সাপেক্ষে সংসদ আইনের দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হয় ৷ প্রয়োজনে স্থানীয় সরকারের আলাদা কর্মবিভাগ, কর্ম কমিশন ও ক্যাডার পদ সৃষ্টি করে এ সার্ভিসের উন্নতি সাধন করতে হবে ৷

সরকার সাংবিধানিক অভিপ্রায় অনুসারে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য যুগোপযোগী নতুন আইন প্রনয়ণ করেছে ৷ এসব প্রতিষ্ঠানের নির্বাহি প্রধানের দায়িত্ব পালণকারী জনপ্রতিনিধির (চেয়ারম্যান ও মেয়র) পদে দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের ব্যবস্থা গ্রহনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ভিত মজবুত করে গতিশীলতা আরো জোরদারের চেষ্টা চালাচ্ছে ৷ এখন প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার জন্য প্রয়োজন ‘উপযুক্ত জনবল কাঠামো’ এবং ‘প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সামর্থ্য’ ৷ এ দুটি বিষয় সমাধান করা এখন এতোটাই জরুরী ও গুরুত্বপূর্ণ যে, ভিশন’ ২০২১ ও ২০৪১ অর্জনের পথে অবিচ্ছেদ্য সহায়ক শক্তি হিসেবে উপযুক্ত ভূমিকা রাখতে হলে এর কোন বিকল্প নেই ৷ আশার কথা, সরকারের স্থানীয় সরকার বিভাগ ঐসব প্রতিষ্ঠানের নতুন আইনের বাধ্যবাধকতা অনুসারে, জনবল সংশ্লিষ্ট সাংগঠনিক কাঠামো ও চাকরি বিধিমালা প্রনয়ণ করে সম্মতি প্রদানের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে ৷ দীর্ঘ প্রায় দু’বছর ধরে সেখানেই তা আটকে আছে ৷ জাতীয় অগ্রগতি ও উন্নয়নের পথে সহায়ক বিবেচনায় সরকারের উচ্চ মহল বিষয়টি দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য মনযোগী হবেন, এটাই সবার প্রত্যাশা ৷

অপরদিকে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক সামর্থ্য বৃদ্ধির জন্য রাজস্ব আদায় পদ্ধতির উন্নয়ন, রাজস্ব আয়ের ক্ষেত্র বৃদ্ধি, আয় বর্ধক প্রকল্পঃ যেমন-মার্কেট, বিণোদন অবকাঠামো নির্মাণ ইত্যাদি বাস্তবায়ন, রাজস্ব ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন প্রভৃতি নিশ্চিত করতে হবে৷ আয় বর্ধক প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো ভূমি সংকটে জর্জরিত। অথচ গ্রামীণ ও পৌর এলাকায় অবস্হিত সরকারের বহু খাস বা পরিত্যক্ত জমি রয়েছে, যেগুলোর উপযুক্ত ব্যবহার হচ্ছে না এবং অনেকক্ষেত্রে বেহাত হয়ে যাচ্ছে। এসব খাস বা পরিত্যক্ত ভূমি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নিকট ন্যস্ত করা হলে আয় বর্ধক ও বিভিন্ন সেবামূলক প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব হবে। তার ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোর রাজস্ব আয় বাড়বে এবং এলাকাবাসীর আর্থসামাজিক উন্নয়ন তড়ান্বিত হবে। আরেকটি দিক অবশ্যই বিবেচনায় আনতে হবে যে, স্থানীয় সরকার অধিক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সরকারের যেসব আয়ের উৎস রয়েছে, তন্মধ্যেঃ ভূমি উন্নয়ন কর, ভূমি হস্তান্তর ফি, ব্যবসা-বাণিজ্যের উপর কর, যান্ত্রিক যানবাহনের উপর কর, ব্রিজ বা অন্যান্য সেবার উপর টোল ইত্যাদির সম্পূর্ণ বা ক্ষেত্রমত আংশিক হিস্যা অর্পণের ব্যবস্থা করা গেলেও এসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা প্রতিষ্ঠা পেত এবং স্বাবলম্বী হয়ে উঠত ৷ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ‘ইউনিয়ন সার্ভিস ব্যাংক’ ও ‘মিউনিসিপ্যাল সার্ভিস ব্যাংক’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দ্রুত এসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ও অর্থনৈতিক সমস্যাগুলো সুরাহা করা সম্ভব ৷ এ নিয়ে অভিজ্ঞজন ও অংশীদারদের নিয়ে আলোচনা করে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহন করা সময়ের দাবী ৷

তথ্য যোগাযোগ প্রযুক্তি সেবার বিস্তার, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক কর্মকান্ড সম্প্রসারনের মাধ্যমে উচ্চ-আয়ের মর্যাদায় দেশকে উন্নীত করতে সরকার বদ্ধপরিকর ৷ স্থানীয় সরকারকে বাদ দিয়ে তা সম্ভব নয় ৷ কারণ স্থানীয় সরকার ইউনিটগুলোর সমষ্টিই হলো রাষ্ট্র ৷ উন্নত বিশ্বের ধারণা অনুযায়ী স্থানীয় সরকারই হলো আসল সরকার ৷ সুতরাং স্থানীয় সরকারকে উন্নত না করে রাষ্ট্রের সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয় ৷ সরকার এজন্যে বিভিন্ন কর্মসূচী নিয়ে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে ৷ এখন অনিবার্যভাবে প্রয়োজন হলো, ঔপনিবেশিক ধ্যানধারণা প্রসূত ও গতানুগতিক ধারা থেকে বেরিয়ে এসে দ্রুত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষমতায়ন এবং সৃজনশীল ও উদ্ভাবনী ক্ষমতাসম্পন্ন মেধাবীদের এসব প্রতিষ্ঠানে নিয়ে আসা ৷ এজন্যে বিদ্যমান ব্যবস্থার মাঝেই সহজে বাস্তবায়নযোগ্য কিছু সুপারিশ হলোঃ

১. স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে উহাদের স্ব-স্ব অধিক্ষেত্রে বিদ্যমান সরকারের সকল জনসেবা ও উন্নয়ন কাজের দায়িত্ব, ক্ষেত্রমত, ব্যবস্থাপনা বা তদারকির দায়িত্ব অর্পণের ব্যবস্থা গ্রহণ ।

২. স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর জনবল কাঠামো নতুন আইন অনুসারে ও যুগোপযোগী করে পূণঃনির্ধারণ এবং চাকরির পদসমূহ উন্নীতকরণ করা সময়ের দাবী ৷ সকল পদের জন্য যোগ্যতানুসারে পদোন্নতির বিধান করতে হবে।

৩. স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর আলাদা ক্যাডার সার্ভিস গঠণ এবং আলাদা কর্ম কমিশন প্রতিষ্ঠা করে উহার মাধ্যমে যোগ্য কর্মকর্তা নিয়োগের ব্যবস্থা গ্রহন করা যেতে পারে ৷ পরীক্ষা গ্রহনের মাধ্যমে কেবল যোগ্যদের জন্য পদোন্নতির সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।

৪. জাতীয় স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান (এনআইএলজি)-কে আরো শক্তিশালী করে উহার মাধ্যমে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর জনপ্রতিনিধি, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের অধিকহারে উপযুক্ত প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা করতে হবে ৷

৫. স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর স্ব-স্ব অধিক্ষেত্রে অবস্থিত কেন্দ্রীয় সরকারের রাজস্ব আহরণের উৎস সমূহের উপর স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের হিস্যা নির্ধারণের ব্যবস্থা করে তা উহাদের প্রদান করতে হবে ৷

৬. স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর স্ব-স্ব অধিক্ষেত্রে অবস্থিত সরকারের খাস বা পরিত্যক্ত ভূমি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নিকট ন্যস্ত করে আয় বর্ধক ও বিভিন্ন সেবামূলক প্রকল্প বাস্তবায়নের অনুমতি প্রদান করতে হবে।

৭. ইউনিয়ন সার্ভিস ব্যাংক ও মিউনিসিপ্যাল সার্ভিস ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর স্ব-স্ব কার্যালয়ে নিজস্ব ব্যাংকের শাখা চালু করা যাবে ৷ প্রতিষ্ঠানগুলোর সকল রাজস্ব, অনুদান ইত্যাদি আহরণ ও সংরক্ষন, হিসাব পরিচালনা, লেনদেন প্রভৃতি সমূদয় আর্থিক ও অর্থনৈতিক কার্যাদি এসব ব্যাংক শাখার মাধ্যমে নিষ্পন্নের সুবিধা সৃষ্টি করতে হবে ৷

৮. স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর সার্ভিস সমূহে কর্মরতদের জন্য অবিলম্বে পেনশন চালু করতে হবে ৷ সরকার সিড মানির ব্যবস্থা করলে প্রস্তাবিত সার্ভিস ব্যাংকের মাধ্যমে অনায়াসে পেনশন তহবিল পরিচালনা সম্ভব হবে ৷

৯. নাগরিক জীবনে জননিরাপত্তা ও শৃংখলা নিশ্চিত করতে ইউনিয়ন পরিষদের জন্য গ্রাম পুলিশ, পৌরসভার জন্য পৌর পুলিশ এবং সিটি কর্পোরেশনের জন্য নগর পুলিশ নিয়োগ এবং উপযুক্ত প্রশিক্ষন প্রদান করে নিজস্ব ব্যবস্থাধীনে দ্রুত কর্তব্যে নিয়োজিত করতে হবে। সন্ত্রাস ও মাদক নিয়ন্ত্রনে এ দিয়ে কার্যকর সুফল পাওয়া যাবে।

১০. স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় বিদ্যমান বিরোধ মীমাংসা আইনগুলো সংস্কার করে যুগোপযোগী ক্ষমতায়ন দ্বারা শক্তিশালী ও কার্যকর করা অত্যন্ত জরুরী। স্থানীয় শাসন ব্যস্থায় গ্রামীন আদালত, পৌর আদালত ও নগর আদালত কার্যকরভাবে চালু করা গেলে দেশের বিচার বিভাগের উপর চাপ কমে যাবে এবং বিত্তহীনদের বিচার পাওয়ার পথ সুগম হবে।

উপরে যেসব বিষয়ে আলোকপাত করা হলো সেগুলো বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় তথ্য, উপাত্ত, পরিসংখ্যান ইত্যাদি বিশ্লেষন করে উপযুক্ত রূপরেখা প্রনয়ণ, সিদ্ধান্ত গ্রহন ও বিধিবদ্ধ করা সরকারের দায়িত্ব ৷ স্থানীয় সরকার বিষয়ে কর্মক্ষেত্রে অভিজ্ঞজন, গবেষক, অংশীদার, সুবিধাভোগী প্রভৃতি শ্রেণী-গোষ্ঠীর প্রতিনিধিগণের সাথে মত বিণিময় করে সরকার বর্নিত বিষয়ে যত দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহন করবেন, ততই দেশের জন্য মঙ্গল হবে ৷ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় জনগণের অংশগ্রহনের মাধ্যমে প্রকৃত জনসেবা, ন্যায় বিচার, সুশাসন ও টেকসই উন্নয়নের জন্য তা অত্যন্ত জরুরী ও গুরুত্বপূর্ণ।

—মোঃ সামসুল আলম
সভাপতি
বাংলাদেশ পৌর সচিব এসোসিয়েশন ৷
২৮ মার্চ, ২০১৬ খ্রীঃ ৷৷

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

w

Connecting to %s